ভিডিও গল্প: সুতার জাদুকর—সোনারগাঁয়ের জামদানির শেষ মাস্টার তাঁতিদের হাতে রাজকীয় ঐতিহ্যের অমর সৃষ্টি
শত শত বছরের মোগল আভিজাত্য, সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশা এবং মানুষের অতুলনীয় সৃষ্টিশীলতার এক স্বর্গীয় রূপ হলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী জামদানি। ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত এই বিশ্বখ্যাত বয়নশিল্পের সর্বশেষ প্রবীণ মাস্টার তাঁতিদের কর্মযজ্ঞ নিয়ে আমাদের বিশেষ ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টারি বাংলা ঐতিহ্যের এক অপার্থিব মায়াজাল তৈরি করেছে। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের আর্দ্র বাতাসে তাঁতের কাঠের কাঠামোর ছান্দিক খটখট শব্দে সুতার পর সুতা সাজিয়ে কীভাবে একটি রাজকীয় জামদানি জন্ম নেয়, তা ক্যামেরার নিখুঁত ম্যাক্রো লেন্সে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁতিরা কোনো প্রকার মুদ্রিত নকশা বা গ্রাফ পেপারের সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজেদের স্মৃতি ও পূর্বপুরুষের মুখে মুখে শেখা ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করে শূন্যে জটিল জ্যামিতিক ফুলের মোটিফ বুনে চলেছেন। আঙুলের ডগায় বিশেষ বাঁশের তৈরি সূঁচ (কাঁটা) দিয়ে প্রতিটি সুতার বাঁধন তৈরি করার দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন কোনো দক্ষ সুরকার সুরের জাল বুনছেন। একটি খাঁটি শত কাউন্টের ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ি তৈরিতে দুজন দক্ষ কারিগরের টানা ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত অক্লান্ত শ্রমের প্রয়োজন হয়।
প্রবীণ এক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মাস্টার তাঁতি ভিডিও সাক্ষাৎকারে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, 'জামদানি শুধু একটা শাড়ি না, এটা আমাদের কলিজার রক্ত। শীতলক্ষ্যা নদীর বাতাসের যে বিশেষ আর্দ্রতা, তা ছাড়া সুতা নরম থাকে না এবং জামদানির প্রকৃত রূপ ফোটে না। আমাদের বাপ-দাদার এই ঐতিহ্য আমরা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে চাই।' ভিডিওতে ফুটে উঠেছে নতুন প্রজন্মের তরুণদের এই কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার সংকট এবং বর্তমান বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার করুণ বাস্তবতা।
তবে হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটির দ্বিতীয় পর্বে দেখানো হয়েছে কীভাবে একদল আধুনিক তরুণ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সরাসরি তাঁতিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে আন্তর্জাতিক ই-কমার্সের মাধ্যমে সোনারগাঁয়ের জামদানি সরাসরি লন্ডন, নিউইয়র্ক ও প্যারিসের ফ্যাশনপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ফলে কারিগরদের পারিশ্রমিক তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের সন্তানেরাও আবার গর্বের সাথে তাঁত চালানো শিখতে শুরু করেছে।
ভিডিওর সমাপ্তি ঘটেছে পূর্ণাঙ্গ একটি জামদানি শাড়ির প্রদর্শনী দিয়ে, যা আলোর বিপরীতে ধরলে মনে হয় যেন বাতাসের মেঘে ভাসমান কোনো মায়াবী দৃশ্য। ঐতিহ্য ও ভালোবাসার এমন অনন্য মেলবন্ধন বিশ্বকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, জামদানি কেবল একটি পরিধেয় বস্ত্র নয়; এটি বাঙালি জাতির এক অমর সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়।
