ভিডিও অনুসন্ধান: সুন্দরবনের গহিনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পদচিহ্ন—ক্যামেরা ট্র্যাপ ও ড্রোন নজরদারিতে বাঘ রক্ষার রোমাঞ্চকর লড়াই
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং জাতিসংঘের ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনের নিভৃত ও দুর্গম জঙ্গল জুড়ে চলছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণের এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর বৈজ্ঞানিক কর্মযজ্ঞ। বন অধিদপ্তর ও ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে ধারণকৃত এই বিশেষ অনুসন্ধানী ভিডিও প্রতিবেদনে সুন্দরবনের ভেতরে স্থাপিত সহস্রাধিক স্বয়ংক্রিয় ইনফ্রারেড ক্যামেরা ট্র্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ নজরদারি ড্রোনের ক্যামেরায় বাঘের রাজকীয় বিচরণ, শিকার পদ্ধতি এবং সদ্য জন্ম নেওয়া বাঘের বাচ্চাদের সাথে বাঘিনীদের অপার স্নেহের মায়াবী দৃশ্য প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সুন্দরবনের কটকা, কচিখালী ও নীলকমলের গহিন নদী ও খালের কাদা ভেদ করে কীভাবে এক নিঃশব্দ রাজকীয় মহিমায় শিকারের সন্ধানে এগিয়ে চলেছে একটি পূর্ণবয়স্ক ডোরাকাটা বাঘ। ক্যামেরা ট্র্যাপের আধুনিক নাইট-ভিশন সেন্সর রাতের আঁধারেও অতি উজ্জ্বল ও স্পষ্ট ফোর-কে ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। এই ক্যামেরায় ধারণকৃত হাজার হাজার ঘণ্টার ফুটেজ আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি বাঘের শরীরের স্বতন্ত্র ডোরাকাটা দাগ (স্ট্রাইপস) বিশ্লেষণ করে বাঘের সঠিক সংখ্যা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়েছে বনরক্ষী ও বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শ্বাসরুদ্ধকর জীবনের বাস্তব চিত্র। তীব্র লবণাক্ত পানির প্রতিকূল পরিবেশ, হিংস্র বন্যপ্রাণীর আক্রমণ এবং বিপজ্জনক চোরাকারবারীদের হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে তারা কীভাবে দিন-রাত এক করে সুন্দরবনের প্রতিটি কোনায় টহল দিচ্ছেন, তা ফুটে উঠেছে ক্যামেরায়। স্মার্ট পেট্রোলিং জিপিএস সিস্টেম এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে হরিণ শিকার ও বাঘ চোরাচালান সম্পূর্ণ শূন্যে নেমে এসেছে।
ভিডিওতে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় বাওয়ালি, মৌয়ালি ও জেলেদের সচেতনতার অনন্য দৃষ্টান্ত দেখানো হয়েছে। লোকালয়ে কোনো বাঘ ভুলবশত চলে এলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করার সনাতন নির্মম সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে এখন স্থানীয় 'টাইগার রেসপন্স টিম' (ভিটিআরটি) বন বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে বাঘটিকে নিরাপদে ট্রাঙ্কুলাইজ করে গহিন অরণ্যে ফেরত পাঠাচ্ছে। বাঘ ও মানুষের এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আন্তর্জাতিক সংরক্ষণবাদীদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
বন সংরক্ষক প্রধান জানান, বিগত কয়েক বছরের সফল ও সমন্বিত সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে ১২৫টিতে উন্নীত হয়েছে, যা বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই প্রাণবন্ত ভিডিও প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, সঠিক বৈজ্ঞানিক নজরদারি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আন্তরিক ভালোবাসায় আমাদের জাতীয় অহংকার রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দরবনের বুকে চিরকাল স্বগৌরবে গর্জে উঠবে।
