অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র: অবৈধ বালু উত্তোলনে বিলীন হচ্ছে জনপদ—স্যাটেলাইট টেলিমেট্রি ও গোপন ক্যামেরায় বালু সিন্ডিকেটের পর্দাফাঁস
নদীমাতৃক বাংলাদেশের মেঘনা, পদ্মা ও যমুনা নদীর বুকে প্রভাবশালী অসাধু সিন্ডিকেটের অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে কীভাবে শত শত ফসলি জমি, স্কুল, মসজিদ ও প্রাচীন জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তার এক লোমহর্ষক ও সাহসী অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র তৈরি করেছে আমাদের বিশেষ টিম। দীর্ঘ তিন মাস ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেন্টিনেল-২ উপগ্রহের হাই-রেজোলিউশন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং নদীর চরাঞ্চলে রাতে পরিচালিত গোপন ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণকৃত এই ভিডিও ফুটেজে অবৈধ বালু ড্রেজার ও মধ্যরাতের বালু বাণিজ্যের এক বিপজ্জনক অন্ধকার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, দিনে যেখানে নদী শান্ত থাকে, রাতে অন্ধকার নামতেই শতাধিক শক্তিশালী নিষিদ্ধ কাটার সাকশন ড্রেজার এসে নদীর পাড়ের মাত্র কয়েক মিটারের মধ্যে গভীর গর্ত করে বালু তুলতে শুরু করে। স্যাটেলাইট টেলিমেট্রি ডাটা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যেখানে সরকার নির্দিষ্ট বালুমহাল ইজারা দিয়েছে, সিন্ডিকেট তার তোয়াক্কা না করে নদী প্রতিরক্ষা বাঁধের গোড়া থেকে বালু চুরি করছে। ফলে নদীর নিচের প্রাকৃতিক মাটির ভারসাম্য ভেঙে পড়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুরো গ্রাম নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যচিত্রটিতে নদীভাঙনের শিকার নিঃস্ব মানুষের বুকফাটা কান্না ও দুর্দশা ক্যামেরায় অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে ধারণ করা হয়েছে। একসময় যার শত বিঘা ধানি জমি ও পাকা বাড়ি ছিল, বালু উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট ভাঙনে তিনি আজ পথের ভিখারিতে পরিণত হয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই ড্রেজারগুলো পরিচালিত হওয়ায় প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পান না; প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে সন্ত্রাসীদের হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি।
আমাদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে ড্রেজারে ব্যবহৃত কোটি টাকার তেল সরবরাহ এবং ক্যাশ টাকার অবৈধ লেনদেনের গোপন দৃশ্য। এই অনুসন্ধান চলাকালে নৌপুলিশ ও জেলা প্রশাসনের বিশেষ যৌথ টাস্কফোর্সকে সরাসরি অভিযান পরিচালনায় সহায়তা করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মাঝনদীতে পরিচালিত সাঁড়াশি অভিযানে কীভাবে ৫০টিরও বেশি অবৈধ ড্রেজার পাইপলাইন ও কোটি টাকার যন্ত্রপাতি জব্দ করা হয় এবং একাধিক ড্রেজারকে সেখানেই অকার্যকর করে দেওয়া হয়।
নদী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ আইনজীবীরা এই তথ্যচিত্রটি দেখে অবিলম্বে নদী রক্ষা আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সকল নদীতে বালু উত্তোলন সার্বক্ষণিক উপগ্রহ টেলিমেট্রি নজরদারির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এই সাহসী অনুসন্ধানী ভিডিওটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে নদী খেকো বালু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এক আপসহীন ও সর্বাত্মক যুদ্ধের ডাক দিয়েছে, যা দেশের নদী ও জনপদ রক্ষায় এক যুগান্তকারী দলিল হয়ে থাকবে।
