চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের উপকূলজুড়ে অবস্থিত জাহাজ পুনর্প্রক্রিয়াজাতকরণ বা শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে এক ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। অতীতে যেখানে বিপজ্জনকভাবে উন্মুক্ত সৈকতে হাতুড়ি দিয়ে জাহাজ কেটে শ্রমিকদের প্রাণহানি এবং সমুদ্র দূষণের অভিযোগ ছিল, সেখানে আজ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) প্রণীত 'হংকং কনভেনশন' শতভাগ অনুসরণ করে সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলো রূপান্তরিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশবান্ধব 'গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড'-এ। আমাদের বিশেষ ভিডিও টিম ড্রোন ও অ্যাকশন ক্যামেরার সাহায্যে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র ক্যামেরাবন্দী করেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, পুরোনো ভাঙা ইয়ার্ডগুলোর বদলে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে সুবিশাল শতভাগ কংক্রিট বাধানো প্ল্যাটফর্ম। বিশালাকার ক্রুড ওয়েল ট্যাংকার বা কন্টেইনার জাহাজগুলো যখন সৈকতে আনা হয়, তখন সেখান থেকে কোনো প্রকার বিষাক্ত তেল, অ্যাসবেস্টস বা সীসা মিশ্রিত পানি যাতে সমুদ্রের পানিতে মিশতে না পারে, সে জন্য স্থাপন করা হয়েছে বিশেষ অয়েল ইন্টারসেপ্টর ও ড্রেনেজ সিস্টেম। আধুনিক ভারি কাটিং গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ম্যাগনেটিক লিফটার ব্যবহার করে কয়েক টন ওজনের ইস্পাতের পাতগুলো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
শ্রমিকদের সুরক্ষায় আনা বৈপ্লবিক পরিবর্তন ভিডিওতে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি শ্রমিকের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সার্টিফাইড ফায়ার-প্রুফ পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), অটোমেটেড এয়ার রেসপিরেটর এবং সার্বক্ষণিক গ্যাস ডিটেক্টর। বিষাক্ত কোনো গ্যাস ট্যাংকের ভেতর আছে কিনা তা রোবটিক সেন্সর দিয়ে পরীক্ষার পরই কেবল প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ইয়ার্ড প্রাঙ্গণে শ্রমিকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক ৫০ শয্যার বার্ন অ্যান্ড ট্রমা হাসপাতাল এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ একাডেমি, যার ফলে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ভিডিও সাক্ষাৎকারে জানান, জাপান, নরওয়ে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানিগুলো এখন অত্যন্ত আস্থার সাথে তাদের পুরোনো জাহাজ বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। গ্রিন শিপইয়ার্ডের এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের স্টিল শিল্পকে দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্পাত চাহিদার সিংহভাগ পরিবেশবান্ধবভাবে জোগান দিতে সহায়তা করছে, যা হাজার হাজার কোটি টাকার মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, টেকসই অর্থনীতির পথে এটি একটি মাইলফলক অর্জন। সঠিক নীতি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করলে যে কোনো ভারী ও বিপজ্জনক শিল্পকেও পরিবেশবান্ধব ও মানবিক রূপ দেওয়া সম্ভব, সীতাকুণ্ডের রূপান্তর সমগ্র বিশ্বের সামনে তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।