ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র: সুরের খোঁজে মধ্যরাতের ঢাকা—আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক ও নতুন প্রজন্মের স্বাধীন ব্যান্ডগুলোর আত্মপ্রকাশ
দিনের কোলাহল শেষে যখন নিস্তব্ধতা নামে তিলোত্তমা ঢাকার রাজপথে, তখন শহরের বিভিন্ন গলির নিভৃত বেজমেন্ট, গ্যারেজ আর ছাদে জেগে ওঠে একদল স্বপ্নবাজ তরুণের সুরের জগৎ। মূলধারার বাণিজ্যিক সঙ্গীতের বাইরে গিয়ে নিজস্ব চিন্তা, দ্রোহ, ভালোবাসা ও সামাজিক বাস্তবতাকে গিটারে তুলে ধরা এই তরুণদের নিয়ে আমাদের তৈরি অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র 'সাউন্ডস অব দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড'। ঢাকা শহরের ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের ছোট ছোট রিহার্সাল প্যাডে রাত জেগে চলা সুরের সাধনা ক্যামেরাবন্দী করেছে আমাদের ভিডিও ইউনিট।
ভিডিওতে দেখা যায়, স্যাঁতসেঁতে সাউন্ডপ্রুফ করা ছোট এক চিলতে ঘরে ড্রামসের ভারী বিট, ইলেকট্রিক গিটারের তীব্র রিফ এবং তরুণের আবেগঘন কণ্ঠস্বরে যেন গোটা ঘর কাঁপছে। তারা কোনো দামি রেকর্ড লেবেলের তোয়াক্কা করেন না; নিজেদের তৈরি সুর তারা রেকর্ড করছেন সাধারণ ল্যাপটপ ও সাউন্ড কার্ডে এবং সরাসরি ইউটিউব ও স্পটিফাইয়ে উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন। এই স্বাধীন বা ইন্ডি মিউজিশিয়ানদের গানগুলো কোনো প্রমোশন ছাড়াই লক্ষ লক্ষ তরুণ শ্রোতার প্লেলিস্টের শীর্ষে স্থান করে নিচ্ছে।
প্রামাণ্যচিত্রটিতে ইন্ডি ব্যান্ডের একাধিক ভোকাল ও সঙ্গীতশিল্পীর সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়েছে। তারা জানান, তাদের গানের প্রতিটি শব্দ বাস্তব জীবনের গল্প বলে। মধ্যবিত্তের না বলা কান্না, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিয় ক্যাম্পাসের স্মৃতি, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ তাদের গানের প্রধান প্রেরণা। কোনো করপোরেট স্পন্সর ছাড়াই শহরের বিভিন্ন ছোট ক্যাফে ও আর্ট সেন্টারে তাদের আয়োজিত টিকিটযুক্ত গিগ বা কনসার্টগুলোতে তরুণ দর্শকদের উপচেপড়া ভিড় স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিদীপ্ত স্বাধীন সঙ্গীতের আবেদন কতটা গভীর।
ভিডিওতে এই তরুণ মিউজিশিয়ানদের ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংগ্রামের দিকও অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিতে দেখানো হয়েছে। রক্ষণশীল পরিবারের বাধা, সাউন্ড সরঞ্জামের চড়া দাম এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা কীভাবে সঙ্গীতের প্রতি নিজেদের তীব্র ভালোবাসা ধরে রেখেছেন, তা দেখে চোখ ভিজে ওঠে। অনেক তরুণ মিউজিশিয়ান দিনের বেলা সফটওয়্যার কোডিং বা শিক্ষকতা করছেন এবং রাতের বেলা সঙ্গীতের সাধনায় নিমগ্ন থাকছেন।
সঙ্গীত সমালোচকরা এই প্রামাণ্যচিত্র দেখে মন্তব্য করেছেন, বাংলা ব্যান্ডের যে স্বর্ণযুগ নব্বইয়ের দশকে শুরু হয়েছিল, আজকের এই ইন্ডি মিউজিশিয়ানরা তাকে এক নতুন আধুনিক ও আন্তর্জাতিক রূপ দিতে চলেছেন। এই প্রামাণ্য ভিডিওটি প্রমাণ করে যে, সুরের কোনো সীমানা নেই; সত্য ও গভীর অনুভূতি থেকে যে সুরের সৃষ্টি হয়, তা যুগে যুগে মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে বেঁচে থাকে।
