জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে ক্ষয়ক্ষতি তহবিল দ্রুত কার্যকর করার জোরালো দাবি: অনুদানভিত্তিক অর্থায়নে বাংলাদেশের নেতৃত্ব
আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে (কপ) বিশ্বমঞ্চে ক্ষতিগ্রস্ত ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে তীব্র ও জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং ঘন ঘন প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা তুলে ধরে অবিলম্বে ঐতিহাসিক 'ক্ষতিপূরণ ও ক্ষয়ক্ষতি' (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) তহবিল পূর্ণাঙ্গরূপে ছাড়ের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।
সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের প্লেনারি সেশনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে জলবায়ু সংকটের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই তহবিল কোনোভাবেই ঋণ বা বাণিজ্যিক শর্তে প্রদান করা যাবে না; এটি হতে হবে সরাসরি অনুদান (গ্রান্টস), যা ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণে সরাসরি ব্যয়িত হবে। ঋণের নামে জলবায়ু অর্থায়ন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে নতুন ঋণের জালে আবদ্ধ করবে বলে তিনি বিশ্ব নেতৃত্বকে সতর্ক করেন।
বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থায়নে উদ্ভাবিত জলবায়ু অভিযোজন কৌশলগুলো বিশ্ব প্রতিনিধিদের সামনে বিশদভাবে তুলে ধরে। বিশেষ করে সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের সাইক্লোন শেল্টার নেটওয়ার্ক, লবণাক্ততা-সহনশীল ধান উদ্ভাবন এবং ভাসমান কৃষিপদ্ধতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী ও কূটনীতিকদের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশকে অভিযোজন কৌশলের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট (এলডিসি) এবং অ্যালায়েন্স অব স্মল আইল্যান্ড স্টেটস (এওএসআইএস) সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশের প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছে। তারা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিলের প্রতিশ্রুতি কাগুজে চুক্তিতে সীমাবদ্ধ না রেখে তা স্বচ্ছতার সাথে আন্তর্জাতিক তহবিলের মাধ্যমে বিতরণ করতে হবে। তহবিলের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে দুর্যোগকবলিত দেশগুলোর জন্য সরাসরি অর্থ প্রাপ্তির ব্যবস্থা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আন্তর্জাতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষকরা অভিমত দিয়েছেন, বাংলাদেশের এই সাহসী ও তথ্যভিত্তিক অবস্থান জলবায়ু কূটনীতিতে উন্নয়নশীল বিশ্বের দরকষাকষির সক্ষমতাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নে এবং উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে এই সম্মেলন এক ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হবে।
