মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি ঘোষণা: নীতি সুদহার বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নতুন নির্দেশনা
দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন প্রান্তিক মুদ্রানীতি বিবৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর স্পষ্ট জানান, মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপ প্রতিহত করতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) আরও ৫০ বেসিস পয়েন্ট বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। একইসঙ্গে রিভার্স রেপো এবং স্পেশাল রেপো রেটেও আনুপাতিক সমন্বয় সাধন করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত তারল্য প্রবাহকে শৃঙ্খলিত করবে।
মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় গভর্নর উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে নানা অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে মুদ্রাসংকোচন নীতি অব্যাহত রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করে ৯.৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে কৃষি, কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং উচ্চ মূল্য সংযোজিত রপ্তানিমুখী খাতের উৎপাদনশীল কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমগুলো সম্পূর্ণ সচল থাকবে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে গভর্নর জানান, বিগত কয়েকমাসে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদক্ষেপের ফলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। রেমিট্যান্সের ওপর ঘোষিত ব্যাংকিং প্রণোদনা এবং হুন্ডি বিরোধী কঠোর নজরদারির কারণে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে প্রায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বিনিময় হারকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক ও ক্রলিং পেগ ব্যান্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থিতিশীল রাখার প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে নিরাপদ মাত্রায় ধরে রাখতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকরা এই মুদ্রানীতিকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তারা বলেন, সুদহার বাড়ানোর ফলে স্বল্পমেয়াদে ঋণগ্রহীতাদের জন্য মূলধনের খরচ কিছুটা বাড়লেও পণ্যের কৃত্রিম মজুতদারি ও অনাবশ্যক অনুৎপাদনশীল বিনিয়োগ বন্ধ হবে। এতে বাজারে প্রকৃত চাহিদার সাথে জোগানের ভারসাম্য তৈরি হবে এবং ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ আগামী দুই প্রান্তিকের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় করা এবং শীর্ষ ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রতিটি ব্যাংকে অডিট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটিকে শতভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল পণ্যের এলসি খোলার ওপর বিদ্যমান শতভাগ মার্জিন শর্ত বহাল থাকবে, যাতে জাতীয় সঞ্চয় ও বৈদেশিক মুদ্রা কেবল দেশের প্রকৃত শিল্পায়ন ও অবকাঠামো সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকে।
