পদ্মা সেতু রেল সংযোগে ঢাকা-যশোর রুটে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ট্রেন চালু: দক্ষিণ-পশ্চিমের অর্থনীতিতে ঐতিহাসিক বিপ্লব
ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেল করিডোরে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী এবং ভারী কনটেইনার মালবাহী ট্রেন চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ভোরে সুসজ্জিত আধুনিক ব্রডগেজ ইন্টারসিটি ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার কয়েক কোটি মানুষের বহু যুগের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করল। এই ঐতিহাসিক সংযোগের ফলে রাজধানী ঢাকা থেকে যশোর, খুলনা ও বেনাপোলের যাতায়াত দূরত্ব অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং ভ্রমণের সময় চার ঘণ্টার নিচে চলে এসেছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক যৌথভাবে নতুন বাণিজ্যিক পরিচালনার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তারা জানান, প্রকল্পটির আওতায় নির্মিত প্রতিটি স্টেশন অত্যাধুনিক সেন্ট্রালাইজড ট্রাফিক কন্ট্রোল (সিটিসি) এবং ইন্টারলকড কম্পিউটারাইজড সিগন্যালিং সিস্টেম দ্বারা সজ্জিত। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি প্রতিদিন বিশেষায়িত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কার্গো ভ্যান চলবে, যাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের টাটকা শাকসবজি, গলদা চিংড়ি, সুস্বাদু পান ও দুগ্ধজাত সামগ্রী মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছে ভোক্তার কাছে তাজা সরবরাহ করা যায়।
মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের লজিস্টিকস সক্ষমতায় এই রেলপথ অভূতপূর্ব গতির সঞ্চার করেছে। আগে যেখানে বেনাপোল থেকে পণ্যবাহী ট্রাক ঢাকায় পৌঁছাতে যানজটের কারণে ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানে এখন রেলপথে কনটেইনারের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগছে মাত্র ৬ ঘণ্টা। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের শিপিং লিড টাইম নাটকীয়ভাবে কমে আসবে, যা বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নির্ভরযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি করবে।
ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও নড়াইলের চেম্বার অব কমার্স নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, রেলপথকে কেন্দ্র করে মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় ইতোমধ্যে নতুন কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি কারখানা এবং আধুনিক ওয়্যারহাউস নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, পরিবহনে জ্বালানি খরচ ও যানজটের দুর্ভোগ মুক্ত হওয়ায় পণ্যের উৎপাদন খরচ প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পাবে, যা আঞ্চলিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে।
পরিবহন গবেষকরা বলছেন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ কেবল একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ধমনী। ভবিষ্যতে এই রেলপথটি এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আঞ্চলিক ট্রানজিট ও অর্থনৈতিক বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হবে, যা জাতীয় জিডিপিতে প্রতি বছর অতিরিক্ত ১.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
