চট্টগ্রাম বন্দরে চতুর্থ প্রজন্মের অটোমেশন চালু: জাহাজ জট মুক্ত হয়ে নতুন বিশ্বমানের রেকর্ড সৃষ্টি
দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর অত্যাধুনিক ডিজিটাল টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক কনটেইনার ট্র্যাকিং প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সর্বকালের নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের অক্লান্ত প্রচেষ্টা এবং শুল্ক বিভাগের সাথে শতভাগ ডিজিটাল ডাটা ইন্টিগ্রেশনের ফলে বহির্নোঙ্গরে দীর্ঘদিনের জাহাজ জট সম্পূর্ণ নিরসন হয়েছে। বর্তমানে কোনো মাদার ভেসেল বা ফিডার জাহাজকে বহির্নোঙ্গরে দীর্ঘ সময় অলস বসে থাকতে হচ্ছে না, যা বন্দরের আন্তর্জাতিক র্যাংকিংকে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে নিয়েছে।
বন্দর চেয়ারম্যান এক বিশেষ প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) আন্তর্জাতিক মানের পোস্ট-প্যানাম্যাক্স কোয়ে গ্যান্ট্রি ক্রেন সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৩৫টিরও বেশি কনটেইনার ওঠানামা সম্পন্ন হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সমকক্ষ। এর ফলে জাহাজের গড় টার্নঅ্যারাউন্ড সময় চার দিন থেকে কমে রেকর্ড ১.৮ দিনে নেমে এসেছে। শিপিং লাইনগুলো জানিয়েছে, আগে যেখানে অতিরিক্ত সময় নষ্ট হওয়ার কারণে ডেউমারেজ চার্জ দিতে হতো, তা এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এই অর্জনকে স্বাগত জানিয়েছে। শিল্পমালিকরা জানান, বন্দরে দ্রুতি নিশ্চিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো এখন বাংলাদেশের সাপ্লাই চেইনের ওপর গভীর আস্থা প্রকাশ করছে। পণ্য খালাসে গতিশীলতা আসায় কাঁচামালের কোনো সংকট তৈরি হচ্ছে না এবং কারখানার উৎপাদন লাইন নিরবচ্ছিন্ন থাকছে।
বন্দরের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে পুরো জেটি এলাকাকে হাই-ডেফিনিশন থার্মাল ও এআই সার্ভিল্যান্স ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। কনটেইনার স্ক্যানিংয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে অটোমেটেড রেডিওঅ্যাকটিভ পোর্টাল মনিটর এবং আধুনিক নন-ইন্ট্রুসিভ ইন্সপেকশন (এনআইআই) স্ক্যানার স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনোপ্রকার কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই কনটেইনারের ভেতরের পণ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, যা রাজস্ব ফাঁকি রোধে বৈপ্লবিক অবদান রাখছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের এই আধুনিকায়ন বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির অভিযাত্রাকে বেগবান করবে। ভবিষ্যতে বে-টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর পুরোপুরি সচল হলে চট্টগ্রাম বন্দর পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক প্রধান ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট গেটওয়ে হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
