সিলেটের সুরমা ভ্যালিতে অর্থোডক্স চায়ের বাম্পার ফলন: বিশ্ববাজারে বাড়ছে প্রিমিয়াম ব্ল্যাক ও হোয়াইট চায়ের কদর
শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও সুরমা উপত্যকার ঐতিহাসিক চা বাগানগুলোতে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি এবং জলবায়ু-সহনশীল পরিচর্যার সমন্বয়ে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ উন্নতমানের অর্থোডক্স চায়ের বাম্পার ফলন অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশেষায়িত চা বাজারে প্রচলিত দানাদার সিপিসির পরিবর্তে হাতে প্রস্তুত ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধযুক্ত অর্থোডক্স ব্ল্যাক, গ্রিন এবং হোয়াইট চায়ের বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় দেশের অন্যতম প্রাচীন এই রপ্তানি শিল্পে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ড ও শ্রীমঙ্গল চা নিলাম কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে অর্গানিক এবং ক্লোনাল জাতের চায়ের পাতার সর্বোচ্চ গুণমান নিশ্চিত করা হয়েছে। লন্ডন, হামবুর্গ এবং দুবাইয়ের শীর্ষস্থানীয় খাদ্য ও পানীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নিলামে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশি অর্থোডক্স চায়ের জন্য রেকর্ড পরিমাণ মূল্য হাঁকিয়েছে। এতে প্রতি কেজি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চায়ের দাম স্থানীয় নিলামে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শিল্পের মুনাফাকে দৃঢ় করেছে।
চা বাগান মালিক ও অভিজ্ঞ টি-প্ল্যান্টাররা জানান, বাগানগুলোতে আধুনিক ডিপ-ড্রিপ ইরিগেশন, পরিবেশবান্ধব ছায়াবৃক্ষ রোপণ এবং ক্ষতিকর কীটনাশকের পরিবর্তে বায়ো-পেস্টিসাইড ব্যবহারের ফলে পাতার ঘ্রাণ ও লিকারের রঙ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ে বৃষ্টিপাত বা তীব্র খরার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের ব্যবহার এ বছর উৎপাদন বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও অধিকার সুরক্ষাতেও এ বছর দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বাগান পঞ্চায়েত ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সাথে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে মজুরি বৃদ্ধি, উন্নত স্যানিটেশন, সার্বক্ষণিক বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোবাইল ক্লিনিক চালু করা হয়েছে। শ্রমিকদের সন্তান-সন্ততিদের জন্য চা বোর্ডের বৃত্তির পরিধি বাড়ানোয় শ্রমিক পরিবারগুলোর মধ্যেও স্বস্তি ও কাজের উদ্দীপনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি বাগানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী চা শিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্য প্রদর্শনীগুলোতে 'টিপিভি সিলোন বা আসামের বিকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের অনন্য স্বাদের চা' এই স্লোগানে বিশেষায়িত ব্র্যান্ডিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী কয়েক বছরে চা রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করবে।
