কক্সবাজারে তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল 'সি-মি-উই-৬' যুক্ত হলো জাতীয় গ্রিডে: দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত
দেশের টেলিযোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক ডেটা যোগাযোগের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। কক্সবাজারের ঝিলংজায় স্থাপিত দেশের দ্বিতীয় ল্যান্ডিং স্টেশনে আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল কনসোর্টিয়ামের অত্যাধুনিক 'সি-মি-উই-৬' (সাউথইস্ট এশিয়া-মিডল ইস্ট-ওয়েস্টার্ন ইউরোপ ৬) সিস্টেম আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ডেটা গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতায় এক লাফে অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার জিবিপিএস (গিগাবিটস পার সেকেন্ড) উচ্চগতির হাই-স্পিড ডেটা পাইপলাইন যুক্ত হলো, যা ভবিষ্যৎ ডিজিটাল অর্থনীতি ও শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি সুদৃঢ় করল।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) এর শীর্ষ প্রকৌশলীরা এই বাণিজ্যিক উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, নতুন এই ক্যাবলটি সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সিঙ্গাপুর, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ফ্রান্স পর্যন্ত বিস্তৃত। আধুনিক সাবমেরিন অপটিক্যাল রিপিটার এবং কোহেরেন্ট ট্রান্সমিশন প্রযুক্তির কারণে এই লাইনে ডেটা স্থানান্তরের ল্যাটেন্সি বা বিলম্বের হার আন্তর্জাতিক গড়ের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম। ফলে ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ফিনটেক সেবায় তাৎক্ষণিক ডেটা লেনদেন নিশ্চিত হবে।
দেশের সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, ফ্রিল্যান্সার এবং আইসিটি খাতের স্টেকহোল্ডাররা এই সংযোজনকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়েছেন। বর্তমানে দেশে প্রায় দশ লাখের বেশি সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। নতুন ক্যাবলের উচ্চগতির ফলে ডেটা ড্রপআউট বা ইন্টারনেট স্পিড কমে যাওয়ার কোনো শঙ্কা থাকবে না। এছাড়া যে কোনো একটি সাবমেরিন ক্যাবল মেরামত বা প্রাকৃতিক কারণে বিচ্ছিন্ন হলেও বিকল্প হিসেবে এই লাইন পুরো দেশের ইন্টারনেট সংযোগকে পূর্ণ গতিতে সচল রাখতে সক্ষম।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্ট গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশে আধুনিক হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিবেশ তৈরি হলো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল নিজের ডেটা ব্যবস্থাপনাই করবে না, বরং প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে উচ্চমূল্যে ব্যান্ডউইথ রপ্তানি করে কোটি কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রত্যন্ত চরাঞ্চল, পার্বত্য জেলা এবং উপকূলীয় দ্বীপগুলোতেও এই উচ্চগতির ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। স্মার্ট শিক্ষা, টেলিমেডিসিন এবং ই-গভর্ন্যান্সের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে এই সাবমেরিন ক্যাবল এক অপ্রতিরোধ্য মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে, যা প্রতিটি নাগরিকের জন্য তথ্যপ্রযুক্তির সুষম প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে।
