বগুড়ায় গ্রিনহাউস ও হাইড্রোপনিক প্রযুক্তির স্মার্ট বিপ্লব: মাটির স্পর্শ ছাড়াই উৎপাদিত হচ্ছে উচ্চমূল্যের নিরাপদ সবজি
উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান কৃষি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র বগুড়ায় নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার হাই-টেক গ্রিনহাউস এবং সেন্সর-নিয়ন্ত্রিত হাইড্রোপনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সবজি ও ফল চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করছেন তরুণ কৃষি প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তারা। মাটির সংস্পর্শ ছাড়াই কেবল পুষ্টিসমৃদ্ধ পানির দ্রবণে নিয়ন্ত্রিত জলবায়ু বজায় রেখে ক্যাপসিকাম, রঙিন চেরি টমেটো, লেটুস, বেবি কর্ন ও ইউরোপিয়ান স্ট্রবেরি উৎপাদন করে তারা স্থানীয় বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)-এর সমন্বিত কারিগরি সহযোগিতায় এই প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) সেন্সরের মাধ্যমে গ্রিনহাউসের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং সূর্যালোকের পরিমাণ রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে স্বয়ংক্রিয় ফগিং সিস্টেম চালু হয়ে পরিবেশ শীতল করে। এতে প্রচলিত চাষাবাদের তুলনায় পানির অপচয় প্রায় ৮০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে এবং কীটনাশকের ব্যবহার নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়।
সফল তরুণ উদ্যোক্তারা জানান, সনাতন পদ্ধতিতে যেখানে এক বিঘা জমিতে মৌসুমি সবজি চাষ করে সীমিত লাভ হতো, সেখানে একই জমিতে উল্লম্ব (ভার্টিক্যাল) হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে প্রায় চারগুণ বেশি ফলন উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এই নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত সবজি রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় পাঁচতারা হোটেল, সুপারশপ এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোর ক্যাফেটেরিয়ায় উচ্চমূল্যে সরাসরি সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আকস্মিক খরা, অতিবৃষ্টি ও মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ার যে বৈশ্বিক সংকট দেখা দিয়েছে, তা মোকাবেলায় এই প্রিসিশন বা নির্ভুল কৃষি ব্যবস্থা এক যুগান্তকারী মডেল। সরকার তরুণ কৃষি স্নাতকদের এই খাতে উৎসাহিত করতে স্বল্প সুদে বিশেষ উদ্ভাবনী তহবিল এবং শুল্কমুক্ত গ্রিনহাউস সরঞ্জাম আমদানির সুবিধা প্রদান করেছে।
প্রকল্পের আওতায় আশপাশের সাধারণ প্রান্তিক কৃষকদেরও আধুনিক হাইড্রোপনিক পদ্ধতির প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বগুড়ার এই সফল মডেলটি ইতোমধ্যে রাজশাহী, নাটোর ও সিরাজগঞ্জেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের কৃষি অর্থনীতিকে এক উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাণিজ্যিক রূপ উপহার দিচ্ছে।
