সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রবাসীদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আগাম জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঘটনার পর সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে ঢাকা। এখন সংসদীয় কমিটি জানতে চাইছে, মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর পরিণতির বিষয়টি কেন আগে শনাক্ত করা গেল না এবং দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না।
আটক হওয়ার পর কী ঘটেছিল
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই বাংলাদেশি ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে সৌদি আরবে আটক ছিলেন। তাঁদের একজনের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং অন্যজনের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে মামলার বিস্তারিত বিবরণ, রায়ের অনুলিপি এবং শাস্তি কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ।
ঘটনাটি জানার পর জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশন সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট মামলার তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়ে আগে কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বন্দিদের তালিকায় নাম থাকলেও শনাক্ত হয়নি মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি
ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রায় ১৪ দিন আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রায় আড়াই হাজার বন্দির একটি তালিকা পাঠিয়েছিল। সেই তালিকায় দুই বাংলাদেশির নামও ছিল। কিন্তু তালিকায় ব্যবহৃত শ্রেণিবিন্যাস দেখে জেদ্দা মিশনের কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, তাঁদের ছয় মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তাঁরা যে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি, তা বুঝতে পারেননি বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি তালিকা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না। বন্দিদের অবস্থান ও মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। কারণ, মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি আগে শনাক্ত করা গেলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কূটনৈতিক যোগাযোগ বা অন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল কি না, তা মূল্যায়ন করা সম্ভব হতো।
সংসদীয় কমিটির জবাবদিহির দাবি
২৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তৃতীয় বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী জানান, জেদ্দা মিশন কেন আগে পদক্ষেপ নিতে পারেনি এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো গাফিলতি বা ত্রুটি ছিল কি না, তা জানতে চেয়েছেন সদস্যরা।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকার পরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কেন ঢাকাকে জানানো হয়নি, সে প্রশ্নও তোলেন কমিটির সভাপতি। তাঁর মতে, ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার দুর্বলতা সামনে এনেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর চেয়েছে। জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি সংসদীয় কমিটিকে জানাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জেদ্দা মিশনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, ত্রুটি পাওয়া গেলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে প্রতিবেদন চেয়েছে কমিটি।
নারী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
একই বৈঠকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নির্যাতনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার বাংলাদেশি নারী কর্মী কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ১ থেকে ২ শতাংশ নির্যাতনের শিকার হন বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, নির্যাতনের শিকার ১ হাজার ৩৬৪ জন নারী গৃহকর্মীকে উদ্ধার করে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, নির্যাতনের হার ১ থেকে ২ শতাংশ শোনায় কম মনে হলেও এতগুলো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি এ ধরনের নির্যাতন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
নারী কর্মীদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পাসপোর্ট সংগ্রহের সময় তাঁদের সঙ্গে কথা বলা হয় এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও জরিপ চালানো হয় বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে কমিটি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
ঘটনা থেকে সামনে আসা প্রশ্ন
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বিদেশে আটক নাগরিকদের মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং তাঁদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই, গুরুতর সাজা সম্পর্কে দ্রুত অবগত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি মিশনগুলোর ভূমিকা কতটা কার্যকর, তা পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জেদ্দা মিশনের কর্মকর্তাদের গাফিলতি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাব এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পর্যালোচনার পরই দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে।
এখন বাংলাদেশের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে: প্রথমত, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও আইনি নথি সংগ্রহ করা; দ্বিতীয়ত, তথ্য আদান-প্রক্রিয়ায় কোনো দুর্বলতা থাকলে তা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের, বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ও সহায়তা জোরদার করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা শুধু একটি বিচারিক পরিণতির বিষয় নয়; এটি বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা এবং তাঁদের বিপদের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া এবং সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনার পরই ঘটনার দায় ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।




