TPV — the People view
ব্রেকিং
নতুন ব্রেকিং নিউজ লোড হচ্ছে...
অর্থনীতি

মূল্যস্ফীতি, ডলারের চাপ ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি- অক্টোবরজুড়ে চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের অর্থনীতি

রিপোর্টার: Admin•Bangladesh•
মূল্যস্ফীতি, ডলারের চাপ ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি- অক্টোবরজুড়ে চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের অর্থনীতি

অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি ও চাপ—দুই ধরনের চিত্রই দেখা গেছে। একদিকে প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে কিছুটা সহায়তা এসেছে। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, ডলারের বিনিময় হারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা, জ্বালানি ব্যয় এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে। ফলে মাসজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

মূল্যস্ফীতি: মানুষের ব্যয়ের চাপ এখনো কাটেনি

দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগের জায়গা মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে চাপ তৈরি করছে।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে আয়ের বড় অংশ খাবার, বাসাভাড়া, পরিবহন ও চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। বাজারে কোনো কোনো পণ্যের দাম সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে বাড়ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে বাজারে পণ্যের সরবরাহ, মৌসুমি প্রভাব এবং ব্যবসায়ীদের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও দামের ওঠানামায় ভূমিকা রাখছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কমেছে—এমন নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিও বিবেচনায় রয়েছে।

ডলারের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপ

অক্টোবরজুড়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও ডলারের বিনিময় হার ছিল আলোচনায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর ডলারের স্পট রেফারেন্স রেট ছিল প্রায় ১২৩ টাকা ১০ পয়সা। ২৯ অক্টোবর দিনের শেষভাগে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২৪ টাকা ২২ পয়সায়।

ডলারের দাম বাড়ার পেছনে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডলারের বিনিময় হার বাড়লে জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্য আমদানির খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় থেকে ডলারের সরবরাহ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে আমদানি ব্যয় ও ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শুধু রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি দিয়ে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।

রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি, তবে ৩০০ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম নয়

অক্টোবর মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে প্রায় ২৮৭ কোটি ৩৬ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। আগের মাস সেপ্টেম্বরের তুলনায় এই আয় বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায়ও প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

তবে মাসিক রেমিট্যান্স ৩০০ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। এর আগে কয়েক মাস ধরে এই সীমার নিচে থাকার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই প্রবাহ অর্থনীতির জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ানো, বৈধ পথে অর্থ পাঠানো সহজ করা এবং প্রবাসীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিস্থিতিও ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালানি ব্যয় ও পরিবহন খাতে প্রভাব

জ্বালানি খাতও অক্টোবরের অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মাসের শুরুতে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের খুচরা দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। নির্ধারিত দাম ছিল ডিজেল লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা।

তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম ১ অক্টোবর থেকে বেড়ে লিটারপ্রতি ১০৮ টাকা ৭৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। আগের দাম ৯৬ টাকা ৮৬ পয়সা থেকে এই বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন খরচেও প্রভাব পড়ে। ফলে খুচরা জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত থাকলেও অর্থনীতির অন্যান্য খাতে ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি এড়ানো যায় না।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আমদানি পরিস্থিতি

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশের আমদানি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অক্টোবরের পূর্ণাঙ্গ রিজার্ভের হিসাব প্রকাশের আগে সর্বশেষ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় রিজার্ভে ডলারের জোগান বাড়াতে সহায়তা করে। বিপরীতে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য আমদানিতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। তাই রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

অক্টোবরের পুরো মাসের আমদানি ও রপ্তানির চূড়ান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশিত না হওয়ায় এই মাসে বাণিজ্য ঘাটতি কতটা বেড়েছে বা কমেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যানে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চাপ হিসেবে রয়েছে।

রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহ, শ্রমিকদের মজুরি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এ খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

রপ্তানি আয় বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ শক্তিশালী হয় এবং কর্মসংস্থানও বাড়ে। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা রপ্তানিকারকদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, কৃষিপণ্য, ওষুধ ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের বাজার সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা

অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ বিতরণে অনিয়মের মতো সমস্যাগুলো ব্যাংক খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর প্রভাব বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পের ঋণপ্রাপ্তিতেও পড়তে পারে।

উচ্চ নীতি সুদহার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে বজায় রাখা হলেও এর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার খরচ বেশি থাকতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সামগ্রিক অর্থনীতির সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

অক্টোবরের অর্থনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে সুদের হার বেশি রাখতে হচ্ছে; ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে আমদানি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে; আবার শিল্পের উৎপাদন ও বিনিয়োগ সচল রাখতে জ্বালানি ও ঋণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি।

এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরাতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য তদারকি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ করা, জ্বালানি আমদানির ব্যয় ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা।

সব মিলিয়ে অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি একদিকে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির মতো ইতিবাচক সংকেত পেয়েছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপও বহন করেছে। মাসটির পূর্ণাঙ্গ আমদানি-রপ্তানি, রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হলে অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থার আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে। আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রবাসী আয় ও রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়িয়ে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা কতটা ফিরিয়ে আনা যায়।