দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এখন পুরো অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তাঁর মতে, অনিয়মের কারণে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক ব্যাংকই ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) আয়োজনে বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের দ্বিতীয় ও শেষ দিনের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। এর আগে দেশের ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যাগুলো নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বারকাত-ই-খুদা।
মাহবুব উল্লাহ বলেন, ব্যাংক খাতের সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর ভাষায়, দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার গভীরে থাকা সংকটেরই একটি প্রকাশ ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা।
তিনি বাংলাদেশকে একটি ‘এক্সট্র্যাকটিভ স্টেট’ বা শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, এ ব্যবস্থায় অল্পসংখ্যক প্রভাবশালী ধনকুবের বা অলিগার্কের স্বার্থে সম্পদ আহরণ ও বণ্টন করা হয়। শিল্প ও ব্যাংকের বেসরকারীকরণের আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, রাষ্ট্রকেও কার্যত বেসরকারি স্বার্থের অধীন করে ফেলা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রকে নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে সমর্থক ও ঘনিষ্ঠদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা বণ্টন করেছেন।
জাতীয় অধ্যাপকের মতে, পাকিস্তান আমল থেকে প্রতি ১০ থেকে ১৫ বছর পরপর দেশে বড় ধরনের গণ-অভ্যুত্থান ঘটলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এতে মানুষের মধ্যে হতাশা জমেছে। তিনি বলেন, শুধু অভ্যুত্থানই সমাধান নয়; প্রয়োজন নিবেদিত নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট আদর্শিক কাঠামো এবং দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার কার্যকর কর্মসূচি।
ব্যাংকের ওপর আস্থা কমেছে
মাহবুব উল্লাহর দাবি, দেশের অধিকাংশ ব্যাংকই ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাজারের নিয়ম পুরোপুরি কার্যকর হলে এসব ব্যাংকের অনেকগুলো টিকে থাকতে পারত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উপায়ে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তবে এসব উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
তাঁর মতে, ব্যাপক অনিয়মের ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে যাওয়া বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে কিছু ব্যাংক এখনো ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে সেগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে চার-পাঁচটি ব্যাংকের কার্যক্রম পর্যালোচনা করার কথাও বলেন।
সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টিও তুলে ধরেন মাহবুব উল্লাহ। তাঁর মতে, সরকারকে ঋণ দিতে গিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ক্রমেই সরকারের অর্থায়নকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। প্রতি মাসে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ পরিস্থিতিকে সরকারের জন্য সতর্কসংকেত হিসেবে দেখার আহ্বান জানান জাতীয় অধ্যাপক।
ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের যোগসাজশের অভিযোগ
স্বাধীনতার পরের সময়ের কথা স্মরণ করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, তখন অধিকাংশ উদ্যোক্তা নতুন হওয়ায় ব্যাংকারদের গ্রাহকদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। পরে ব্যাংকার, অসাধু ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকদের মধ্যে একটি যোগসাজশ গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই সম্পর্ক ভেঙে ফেলা কঠিন হবে।
অর্থনীতি চালু রাখতে প্রভাবশালী ধনকুবেরদের ওপর নির্ভর করতে হবে—এমন ধারণা থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর সতর্কবার্তা, এবার অর্থনীতি সঠিক পথ থেকে ছিটকে পড়েছে; পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে।
মাহবুব উল্লাহ বলেন, অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেও সংস্কার প্রয়োজন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন একসঙ্গে না হলে সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য গণতন্ত্র ও জবাবদিহির চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে রাতারাতি সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন জাতীয় অধ্যাপক। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটির সাফল্য সত্ত্বেও সেখানে খেলাপি ঋণের সমস্যা রয়েছে। তবে সেসব সমস্যার পেছনে চাহিদা ও সরবরাহের অসামঞ্জস্য কাজ করেছে। তাঁর মতে, পরিকল্পিতভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সংশোধন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে অন্যায়কারীদের প্রত্যাখ্যান করতে সমাজের প্রতি আহ্বান জানান মাহবুব উল্লাহ। তাঁর মতে, অন্যায়কারীদের প্রতি সামাজিক অনাগ্রহ ও প্রত্যাখ্যানের মনোভাব তৈরি হলে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পথ সহজ হতে পারে।



