বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। অক্টোবর মাসে এই খাতে ২৮৭ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আগের মাস সেপ্টেম্বরের তুলনায় আয় বাড়লেও টানা পঞ্চম মাসের মতো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৭ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। গত বছরের একই মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ২৫৬ কোটি ২৪ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
মাসভিত্তিক হিসাবেও রেমিট্যান্স বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছিল ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সে তুলনায় অক্টোবরে আয় বেড়েছে প্রায় ১০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার বা ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
অর্থবছরের প্রথম চার মাসের চিত্র
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১ হাজার ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম চার মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ১৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা প্রায় ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
তবে মাসভিত্তিক প্রবাহে একটি ভিন্ন চিত্রও দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার, আগস্টে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। অক্টোবরেও আয় ৩০০ কোটি ডলারের নিচে থাকায় টানা পাঁচ মাস এই সীমা অতিক্রম করতে পারেনি বাংলাদেশ। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস দেশে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল।
কোন ব্যাংকের মাধ্যমে কত রেমিট্যান্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে এসেছে প্রায় ২১২ কোটি ৭৫ লাখ ডলার।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৫০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ২৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে প্রায় ৪৯১ লাখ ডলার।
একক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৪৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স গ্রহণ করেছে। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক। এই চার ব্যাংকের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় দেশে এসেছে।
অন্যদিকে আটটি ব্যাংক অক্টোবর মাসে কোনো রেমিট্যান্স পায়নি। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।
ডলারের চাহিদা ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাব
রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি থাকলেও কয়েক মাস ধরে মাসিক আয় ৩০০ কোটি ডলারের নিচে থাকা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়, কর্মসংস্থান এবং দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা থাকলে প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ডলারের চাহিদাও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ দিকে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের ওজনযুক্ত গড় বিনিময় হার ছিল ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা। এর আগের কার্যদিবসে এই হার ছিল ১২৩ টাকা ৯৯ পয়সা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলকে আরও সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে অক্টোবর মাসে প্রবাসী আয় আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ৩০০ কোটি ডলারের সীমা অতিক্রম করতে না পারা অর্থনীতির জন্য একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয়। একদিকে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় ও ডলারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপও অব্যাহত রয়েছে। আগামী মাসগুলোতে প্রবাসী আয় কোন গতিতে বাড়ে, তার ওপর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অনেক কিছু নির্ভর করবে।




