খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ ও সশস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মহানগর ও জেলায় খুন হয়েছেন ৭১ জন। এ সময়ে এসব ঘটনায় ৬৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের অভিযান চললেও সহিংস অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় তিনটি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে যুবদলের দুই নেতা আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এবং এর আগের রাতে বটিয়াঘাটায় পৃথক ঘটনায় তাঁদের গুলি করা হয়। অন্যদিকে, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীর ওপর গুলি চালিয়ে তাঁর ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) আটটি থানায় চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। জেলা পুলিশের অধীন নয়টি থানায় ৩৫টি মামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ জন। সব মিলিয়ে প্রায় প্রতি চার দিনে একটি করে হত্যা মামলা হয়েছে।
মহানগরে গত কয়েক বছরের তুলনায় হত্যার মামলা বেড়েছে। কেএমপির তথ্য বলছে, ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই মামলার সংখ্যা আগের বছরের পুরো সময়ের সমান হয়েছে।
জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি এবং ২০২৫ সালে ৪৯টি হত্যা মামলা হয়। চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫টিতে।
মহানগরের মধ্যে সদর থানায় সবচেয়ে বেশি আটটি হত্যা মামলা হয়েছে। লবণচরায় সাতটি, দৌলতপুরে পাঁচটি, আড়ংঘাটায় চারটি, হরিণটানা ও খালিশপুরে তিনটি করে এবং সোনাডাঙ্গা ও খানজাহান আলী থানায় দুটি করে মামলা হয়েছে।
জেলার অন্যান্য এলাকার মধ্যে রূপসায় সর্বোচ্চ ১২টি হত্যা মামলা হয়েছে। দিঘলিয়া ও পাইকগাছায় পাঁচটি করে, কয়রায় চারটি, ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটায় তিনটি করে, তেরখাদায় দুটি এবং ফুলতলায় একটি মামলা হয়েছে। দাকোপে এ সময়ে কোনো হত্যা মামলা হয়নি। এ ছাড়া জেলায় অন্তত ৩০টি হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
মাদক ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে সহিংসতা
পুলিশের মতে, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা এবং অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক বিরোধ হত্যাকাণ্ডের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত ১৯ আগস্ট নগরের লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রায় ১০০ গজের মধ্যে গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন মঞ্জুরুল ইসলাম (২৩) ও নাজমুল (১৮)। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁদের হত্যা করা হয়।
এরপর গত ২২ অক্টোবর মাত্র ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে আরও দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সকালে পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় তাওহিদুল ইসলামকে। একই দিন সন্ধ্যার পর জিন্নাহপাড়ায় বাড়ির কাছে গুলিতে নিহত হন গৃহবধূ খুশি আক্তার। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দুটি ঘটনার পেছনেই মাদক-সম্পর্কিত বিরোধ থাকতে পারে। হত্যাকাণ্ড দুটির মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে নগরে কয়েকটি অপরাধী গোষ্ঠীর সক্রিয়তার তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, নূর আজিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী ও টেংকি শাওন গ্রুপ। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্রের কারবার, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। জমি, মাছের ঘের, বালুর ব্যবসা, পরিবহন ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিরোধ তৈরি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় বি-কোম্পানির প্রায় ৮০০ সদস্য রয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি দখল এমনকি ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করার অভিযোগও রয়েছে এই গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে।
নূর আজিম ও গ্রেনেড বাবুর গ্রুপের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করেও চাঁদাবাজি করা হচ্ছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
ছিনতাই ও ব্যক্তিগত বিরোধেও গুলি
আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার শুধু হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নেই। ছিনতাই, ভয় দেখানো এবং ব্যক্তিগত বিরোধের ঘটনাতেও গুলি চালানোর অভিযোগ উঠছে।
গত ১৮ অক্টোবর রাতে নগরের পশ্চিম টুটপাড়া আমতলা মোড়ে শেখ জুম্মান রহমান নামের এক যুবককে গুলি করে তাঁর মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে ৩ জুলাই রূপসার নতুন বাজার বেড়িবাঁধ সড়কে গুলিবিদ্ধ হয় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। ২ জুলাই আশিবিঘা এলাকায় গুলিতে আহত হন রাতুল শেখ (২২)।
গত ২৪ অক্টোবর নগরের টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় নিজের দোকানে গুলিবিদ্ধ হন আকাশ কুণ্ডু (৪৫)। চাকরির পাশাপাশি তিনি দোকান পরিচালনা করতেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, ভয় দেখানোর জন্য গুলি করা হয়ে থাকতে পারে। এর পেছনে চাঁদাবাজির কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গত ১৯ মার্চ লবণচরার কৃষ্ণনগরে শেখ রাশেদুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তাঁর বাবা-মা, ভাই ও স্ত্রীকে গুলি করে আহত করে দুর্বৃত্তরা। প্রায় আড়াই মাস পর, ২ জুন রাশেদুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
অস্ত্র উদ্ধার হলেও উদ্বেগ কাটেনি
পুলিশের অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হলেও অপরাধে অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নগরে ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৩৩টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে ৩০টি বিদেশি পিস্তল ও সাতটি বিদেশি রিভলবার রয়েছে। এসব ঘটনায় অস্ত্র আইনে ৪৩টি মামলা হয়েছে এবং ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একই সময়ে জেলা পুলিশ ২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৩টি গুলি উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় ১৮টি মামলা হয়েছে এবং ৩৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। মহানগর ও জেলা মিলিয়ে উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্রের সংখ্যা ৭৬টি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের অনেকগুলো একই ধরনের এবং অধিকাংশই ভারতে তৈরি বলে তাঁদের ধারণা। অস্ত্রগুলো সচল অবস্থায় পাওয়া গেছে। নগরীতে এখনো কয়েক শ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থাকতে পারে বলে গোয়েন্দা পুলিশের অনুমান।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কিছু গোষ্ঠী বিক্রেতা ও সহযোগীদের মোটরসাইকেল, মাসিক বেতন, কমিশন এবং অস্ত্র সরবরাহ করে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা দ্রুত সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া শুধু পুলিশের পক্ষে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
খুলনা সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, একসময় খুলনা শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়নি; বরং এর বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ সহিংসতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান বলেন, সব অপরাধের পেছনে একই কারণ কাজ করছে না। কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, কোথাও ছিনতাই, আবার কোথাও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও অপরাধী গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাতের বেলায় একা চলাচল না করার নির্দেশনা দিয়েছে জেলা পুলিশ। গত ২৩ অক্টোবর রাতে জেলা বিশেষ শাখার (এসবি) পুলিশ সুপারের সই করা দাপ্তরিক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তবে জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে নয়, বরং পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।




