মঞ্চনাটক ও ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার ঐতিহাসিক পুনর্জাগরণ: মহিলা সমিতি ও শিল্পকলায় উপচেপড়া দর্শক
রাজধানীর বেইলি রোডের ঐতিহাসিক মহিলা সমিতি মিলনায়তন এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চনাটকের সোনালী দিনগুলো আবারও ফিরে এসেছে। নাগরিক ব্যস্ততা আর মোবাইল স্ক্রিনের যুগে মানুষ আবারও দলে দলে সপরিবারে ছুটে আসছেন জীবন্ত অভিনয়ের মায়াবী আকর্ষণে। টিকিট কাউন্টারগুলোতে 'হাউসফুল' নোটিশ এবং নাটক শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই দীর্ঘ লাইন প্রমাণ করে যে, বুদ্ধিদীপ্ত মঞ্চনাটকের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি; বরং তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্প্রতি মঞ্চস্থ হওয়া একাধিক রাজনৈতিক ব্যঙ্গনাটক, সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদমূলক নাটক এবং আবহমান বাংলার রূপকথাভিত্তিক প্রযোজনাগুলো দর্শকদের হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। মঞ্চে কুশীলবদের আবেগঘন সংলাপ প্রক্ষেপণ, চমৎকার আলো ও আবহসঙ্গীতের নিখুঁত প্রয়োগ এবং ন্যূনতম সেট ডিজাইনে প্রতীকী ভাব ফুটিয়ে তোলার মুনশিয়ানা নাট্যবোদ্ধাদের বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রায় প্রতিটি প্রদর্শনীর শেষেই দর্শকরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন।
মঞ্চনাটকের পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী 'যাত্রাপালা'র নবজাগরণও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক চমৎকার সুবাতাস বইয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপসংস্কৃতির কবলে পড়ে কলুষিত হওয়া যাত্রাপালাকে উদ্ধার করে শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করেছে জাতীয় যাত্রাপালা উৎসব। ইতিহাসভিত্তিক যেমন 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা', 'মাইকেল মধুসূদন' এবং সমকালীন সচেতনতামূলক যাত্রাপালাগুলো হাজার হাজার সাধারণ দর্শককে রাত জেগে উপভোগ করতে দেখা গেছে।
নাট্য আন্দোলনের অগ্রজ ব্যক্তিত্বরা বলছেন, মঞ্চনাটক কেবল বিনোদন নয়; এটি সমাজের বিবেক জাগ্রত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। ষাটের ও সত্তরের দশকে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে মঞ্চনাটক যেমন জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিল, বর্তমান সময়েও দুর্নীতি, অন্যায় ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে মঞ্চই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ প্রাচীর হিসেবে কাজ করছে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির আধুনিকায়নে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঢাকার পাশাপাশি জেলা শহরগুলোতেও যাতে নিয়মিত নাট্যোৎসব এবং যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হতে পারে, সে জন্য স্থানীয় নাট্যদলগুলোকে আর্থিক অনুদান ও মহড়া কক্ষের সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। নাট্যপ্রেমীরা প্রত্যাশা করছেন, এই সাংস্কৃতিক জাগরণ দেশকে অপসংস্কৃতি ও ধর্মান্ধতা মুক্ত একটি সুস্থ, সুন্দর সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
