রাজধানীতে ঢাকা আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্টের বর্ণাঢ্য প্রত্যাবর্তন: বাউল ও সুফি সুরের মূর্ছনায় মাতল লাখো সঙ্গীতপ্রেমী
দীর্ঘ কয়েক বছরের বিরতির পর রাজধানী ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য ও ঐতিহাসিক আয়োজনে প্রত্যাবর্তন করেছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সঙ্গীত মহোৎসব 'ঢাকা আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্ট'। শীতের মিষ্টি সন্ধ্যায় হাজার হাজার তরুণ-তরুণী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও সঙ্গীতপ্রেমীদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে সুবিশাল স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ। দেশি-বিদেশি শতাধিক প্রখ্যাত লোকসঙ্গীতশিল্পী, সুফি সাধক ও বাউল বাদ্যযন্ত্রীদের অসাধারণ পরিবেশনায় সুরের এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়, যা পুরো শহরকে সুরের বন্যায় ভাসিয়ে দেয়।
উৎসবের উদ্বোধনী সন্ধ্যায় মঞ্চে ওঠেন লালন সাঁইয়ের সাধনভূমির প্রবীণ বাউল শিল্পীরা। একতারা, দোতারা, খমক ও ঢোলের মাদকতাময় ছন্দে যখন বেজে ওঠে 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি' কিংবা 'মিলন হবে কত দিনে', তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে শুরু করে মূল মাঠের হাজার হাজার দর্শক একসাথে কণ্ঠ মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব ঐকতান সৃষ্টি করেন। আন্তর্জাতিক শিল্পীদের মধ্যে তুরস্কের সুফি ঘূর্ণি নৃত্যশিল্পী (ডারভিশ), মালির ঐতিহ্যবাহী কোরা বাদক এবং ভারতের রাজস্থানি লোকসঙ্গীতশিল্পীদের অনবদ্য পরিবেশনা উৎসবকে এক বিশ্বজনীন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, দর্শকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিতে পুরো স্টেডিয়ামকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হয় এবং শতভাগ ডিজিটাল ফ্রি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়। নারী ও বিদেশি দর্শকদের জন্য বিশেষ জোন এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত ফুড কোর্ট ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করায় উৎসবটি পরিণত হয় পরিবারের সকলকে নিয়ে আনন্দ উপভোগের এক অনন্য মিলনমেলায়।
সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা প্রধান অতিথি হিসেবে উৎসবের উদ্বোধন করে বলেন, 'বাউল ও সুফি দর্শনই হলো আবহমান বাংলার প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী পরিচয়। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মশুদ্ধির যে চিরন্তন বাণী আমাদের লোকসঙ্গীত বহন করে, তা বর্তমান সংঘাতময় বিশ্বে শান্তির সবচেয়ে বড় প্রেরণা। এই ফোক ফেস্ট আমাদের সাংস্কৃতিক গৌরবকে বিশ্বদরবারে উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরেছে।'
উৎসবের সমাপনী রাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় আধুনিক ফিউশন ব্যান্ডগুলোর সাথে গ্রামীণ লোকশিল্পীদের যৌথ জুগलबন্দী দর্শকদের উন্মাতাল আনন্দে ভাসিয়ে দেয়। সঙ্গীত সমালোচকরা বলেছেন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের এই অপার্থিব মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে সঙ্গীতের কোনো সীমানা নেই। ঢাকা ফোক ফেস্টের এই সফল প্রত্যাবর্তন বাংলার সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হৃদয়ে চিরভাস্বর করে রাখবে।
