আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ: কান চলচ্চিত্র উৎসবে লাল-সবুজ সিনেমার ঐতিহাসিক জয়জয়কার
বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান ও মর্যাদাপূর্ণ তীর্থভূমি ফ্রান্সের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক বিজয় অর্জিত হয়েছে। উৎসবের অন্যতম প্রধান বিভাগ 'আ সার্তে রিগার্দ'-এ অফিশিয়ালি নির্বাচিত বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী শেষে উপস্থিত কয়েক হাজার বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র সমালোচক, জুরি সদস্য ও দর্শকদের টানা দশ মিনিটের দাঁড়িয়ে করতালির (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) এক অবিস্মরণীয় দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের এই সাফল্যকে দক্ষিণ এশীয় সিনেমার এক নবযুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
চলচ্চিত্রটির কাহিনি গড়ে উঠেছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের সাহসী নারীর সংগ্রাম, সামাজিক ট্যাবু ভাঙার প্রত্যয় এবং আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক রূপ ও মানবীয় অনুভূতির গভীর দার্শনিক মেলবন্ধনকে কেন্দ্র করে। পরিচালক কোনো প্রকার কৃত্রিম মেলোড্রামার আশ্রয় না নিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আলো ও অনবদ্য ক্যামেরা বিন্যাসে এক কাব্যিক ভিজ্যুয়াল নির্মাণ উপহার দিয়েছেন। কান উৎসবের মূল প্রদর্শনী শেষে ভ্যারাইটি এবং হলিউড রিপোর্টার তাদের রিভিউতে লিখেছে, 'এই সিনেমা দেখায় কীভাবে একটি গভীর স্থানীয় গল্প সর্বজনীন মানবীয় আবেদনে রূপ নিয়ে পৃথিবীর যেকোনো দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারে।'
অভিনয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এক অবিস্মরণীয় রূপকথা। নাম ভূমিকায় অভিনয় করা বাংলাদেশি তরুণ অভিনেত্রী তাঁর আবেগঘন, সাবলীল ও প্রাণবন্ত অভিনয়ের জন্য আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডের বিশেষ ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেছেন এবং কান উৎসবের অন্যতম সেরা অভিনেত্রীর মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। রেড কার্পেটে খাঁটি দেশীয় জামদানি শাড়ি পরিধান করে বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরে তিনি বিশ্ব মিডিয়ার অন্যতম মধ্যমণিতে পরিণত হন।
দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে এই ঐতিহাসিক অর্জন বিপুল আনন্দ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) এবং সাধারণ চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এই সাফল্যকে বাংলা সিনেমার পুনর্জন্ম হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাজধানী ঢাকার সিনেপ্লেক্সগুলোতে টিকিট অগ্রিম বুকিংয়ের হিড়িক পড়েছে। বিদেশের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সিনেমা চেইনগুলো চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দেওয়ার জন্য পরিবেশন স্বত্ব কিনে নিয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জানিয়েছেন, তরুণ ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মেধা বিকাশে সরকারি অনুদানের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হয়েছে এবং একটি বিশেষায়িত 'জাতীয় চলচ্চিত্র উন্নয়ন তহবিল' গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক সিনেপ্লেক্স নির্মাণের জন্য স্বল্প সুদে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে, যাতে দেশের প্রান্তিক শহরগুলোতেও আধুনিক সিনেমা হলের নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। বাংলা চলচ্চিত্রের এই আন্তর্জাতিক জয়যাত্রা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে সিনেমা শিল্প দেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক রপ্তানি খাতে পরিণত হবে।
