জাতীয় ফিল্ম আর্কাইভে কালজয়ী বাংলা সিনেমার ফোর-কে ডিজিটাল রিস্টোরেশন: রক্ষা পেল শতবর্ষের অমূল্য চলচ্চিত্র ঐতিহ্য
বাংলা চলচ্চিত্রের শতবর্ষের অমূল্য ও ঐতিহাসিক সেলুলয়েড ফিল্মগুলোকে কালের গর্ভে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে চিরতরে রক্ষা করতে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ এক মহতী ও বৈপ্লবিক আধুনিকায়ন সম্পন্ন করেছে। আগারগাঁওয়ের অত্যাধুনিক ফিল্ম আর্কাইভ ভবনে স্থাপিত দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধুনিক ডিজিটাল ফিল্ম রিস্টোরেশন ল্যাবরেটরির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র, ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের ধ্রুপদী চলচ্চিত্র এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্ধশতাধিক কালজয়ী সিনেমার সেলুলয়েড প্রিন্টকে আল্ট্রা-হাই ডেফিনিশন (ফোর-কে) রেজোলিউশনে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তরিত করা হয়েছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে যথাযথ তাপমাত্রা ও সংরক্ষণের অভাবে বহু ঐতিহাসিক সিনেমার ৩৫ মিলিমিটার সেলুলয়েড রিল অ্যাসিডিক অবক্ষয়, ছত্রাক ও স্ক্র্যাচে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। নতুন রিস্টোরেশন ল্যাবে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের লেজার ফিল্ম স্ক্যানার, আল্ট্রাসনিক ফিল্ম ক্লিনিং মেশিন এবং এআই-চালিত ফ্রেম-বাই-ফ্রেম ড্যামেজ রিপেয়ার সফটওয়্যার। বিশেষজ্ঞ ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়াররা প্রতিটি ফ্রেমের ধুলাবালি, স্ক্র্যাচ ও কালার ফেইডিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নিখুঁত কায়িক পরিশ্রমে অপসারিত করে মূল ছবির প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা এবং নিখুঁত সাউন্ডট্র্যাক পুনরুদ্ধার করেছেন।
পুনরুদ্ধারকৃত কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া', ঋত্বিক ঘটকের 'তিতাস একটি নদীর নাম', খান আতাউর রহমানের 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা' এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কালজয়ী প্রামাণ্যচিত্র 'স্টপ জেনোসাইড'। নবপ্রজন্মের চলচ্চিত্র গবেষক ও শিক্ষার্থীরা যখন ৪কে ডিজিটালাইজড এই মাস্টারপিসগুলো বড় পর্দায় নিখুঁত সাউন্ড ও ঝকঝকে চিত্রে দেখছেন, তখন তারা বিস্মিত ও গর্বিত হয়ে উঠছেন।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, পুনরুদ্ধারকৃত সকল কালজয়ী সিনেমা সাধারণ মানুষের জন্য বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ক্লাউড ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এবং জাতীয় শিক্ষাক্রমের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে এই ক্লাসিক ছবিগুলোর বিশেষ রেট্রোস্পেক্টিভ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সিনেমার ঐতিহাসিক গভীরতাকে তুলে ধরছে।
চলচ্চিত্রবোদ্ধারা বলেছেন, একটি জাতির ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে সংরক্ষণ করার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হলো সিনেমা। ফিল্ম আর্কাইভের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে অনন্তকালের জন্য অমর করে রাখল, যা আগামী শত শত বছর ধরে বাঙালি জাতিকে আত্মমর্যাদার সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচার প্রেরণা জোগাবে।
