ঢাকা এশীয় চারুকলা দ্বিবার্ষিকীতে বিশ্বের ৭০টি দেশের শিল্পীদের মিলনমেলা: আবহমান ঐতিহ্য ও আধুনিক শিল্পের অপূর্ব মেলবন্ধন
দৃশ্যশিল্পের আন্তর্জাতিক মহোৎসবে রূপ নিয়ে রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এক জাঁকজমকপূর্ণ আবহে পর্দা উঠল ঐতিহ্যবাহী 'এশীয় চারুকলা দ্বিবার্ষিকী' (এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে)। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও দুই আমেরিকার প্রায় ৭০টিরও বেশি দেশের সহস্রাধিক খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, ইনস্টলেশন আর্টিস্ট এবং কিউরেটর এই বিশ্বমানের শিল্প আসরে অংশ নিয়েছেন। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা ভবন ও উন্মুক্ত চত্বরজুড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে সমকালীন চিত্রকর্ম, বিশালাকার মেটাল ও পোড়ামাটির ভাস্কর্য, ডিজিটাল ভিডিও আর্ট এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ সাউন্ড ইনস্টলেশন।
এবারের প্রদর্শনীর কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'মানবতা, প্রকৃতি ও রূপান্তর'। শিল্পীরা তাঁদের তুলির আঁচড়ে ও শিল্পকর্মে তুলে ধরেছেন বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের নির্মম বাস্তবতা, যুদ্ধ ও সংঘাতের বিপরীতে শান্তির আকুতি এবং আধুনিক প্রযুক্তি যুগে মানুষের নিঃসঙ্গতা ও আত্মিক অন্বেষণ। প্রদর্শনীর মূল গ্যালারিতে বাংলাদেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের পাশাপাশি জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রাজিল ও মিশরের প্রথম সারির মাস্টার আর্টিস্টদের সৃষ্টিকর্ম শিল্পপ্রেমী ও সংগ্রাহকদের গভীর প্রশংসা কুড়িয়েছে।
প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প, রিকশা পেইন্টিং, নকশিকাঁথা এবং টেরাকোটা শিল্পের সাথে আধুনিক আধুনিক পোস্ট-মডার্ন আর্টের সমন্বয়ে নির্মিত একটি সুবিশাল মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন। আন্তর্জাতিক জুরিবোর্ড সর্বসম্মতভাবে এই ইনস্টলেশনটিকে আসরের শীর্ষ সম্মাননা 'গ্র্যান্ড প্রাইজ' প্রদান করেছে। আন্তর্জাতিক বিচারক প্যানেল তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, এই সৃষ্টি ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সাথে কোনো বিরোধে না রেখে এক গভীর সুরেলা ঐকতানে রূপান্তর করেছে।
বিয়েনালের অংশ হিসেবে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ আর্ট গ্যালারি ও জাদুঘরের কিউরেটররা। তারা বাংলাদেশের তরুণ চিত্রশিল্পীদের মেধা, রঙের বৈচিত্র্য এবং চিন্তার গভীরতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। একাধিক আন্তর্জাতিক আর্ট কিউরেটর বাংলাদেশি প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের আসন্ন ভেনিস বিয়েনালে এবং প্যারিস আর্ট ফেয়ারে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক শিল্পবাজারে বাংলাদেশি চিত্রকর্মের উচ্চমূল্য নিশ্চিত করবে।
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক জানিয়েছেন, মাসব্যাপী এই প্রদর্শনীটি সর্বসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকরা টিকিট ছাড়াই বিশ্বমানের এই শিল্পকর্মগুলো উপভোগ করছেন। এই মহতি আয়োজন ঢাকা শহরকে এক প্রাণবন্ত আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক রাজধানীতে রূপান্তরিত করেছে, যা দেশের সৃজনশীল আত্মবিশ্বাসকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করল।
