অমর একুশে বইমেলায় প্রাণের স্পন্দন: বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইপ্রেমীদের বাঁধভাঙা জোয়ার
বাঙালির মনন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তচিন্তার চিরন্তন মিলনমেলা 'অমর একুশে বইমেলা' বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বর্ণাঢ্য ও আনন্দঘন পরিবেশে পূর্ণ উদ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বসন্তের মৃদু বাতাসে নতুন বইয়ের সুবাসে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা প্রাঙ্গণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী, লেখক, সাহিত্যিক, পাঠক ও সাধারণ নাগরিক সপরিবারে ছুটে আসছেন মেলায়। স্টলগুলোতে পছন্দের বইয়ের পাতা উল্টানো, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ গ্রহণ এবং প্রাণবন্ত সাহিত্য আড্ডায় মেলা প্রাঙ্গণ রূপ নিয়েছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক তীর্থভূমিতে।
এবারের বইমেলায় এসেছে লক্ষণীয় ডিজিটাল আধুনিকায়ন। মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে চালু করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ ডিজিটাল ডিরেক্টরি বুথ এবং মোবাইল অ্যাপ 'একুশে বইমেলা'। এই অ্যাপের মাধ্যমে দর্শকরা এক সেকেন্ডের মধ্যে যেকোনো প্রকাশনীর স্টল নম্বর, নতুন প্রকাশিত বইয়ের নাম এবং মূল্য তালিকা দেখতে পাচ্ছেন। মেলাজুড়ে স্থাপন করা হয়েছে বিনামূল্যে হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই জোন এবং প্রতিটি স্টলে চালু রাখা হয়েছে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা, যা বই কেনাকে করেছে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।
প্রকাশকরা জানিয়েছেন, এবারের মেলায় তরুণ ও উদীয়মান লেখকদের রচিত মৌলিক উপন্যাস, ইতিহাসভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর (সায়েন্স ফিকশন) বইগুলো সর্বাধিক বিক্রি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, মেলায় তরুণ প্রজন্মের বই কেনার অভূতপূর্ব আগ্রহ তা পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করেছে। মেলার শিশু চত্বরেও ছিল চোখে পড়ার মতো উপচেপড়া ভিড়; শিশুদের জন্য সিসিমপুরের প্রিয় চরিত্রগুলোর উপস্থিতি এবং কমিকস ও ছড়ার বইয়ের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ এক চমৎকার উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
বাংলা একাডেমির মূলমঞ্চে প্রতিদিন বিকেলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গবেষণাধর্মী আলোচনা সভা এবং সন্ধ্যায় পরিবেশিত হচ্ছে দেশের শীর্ষ কণ্ঠশিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা এক আলোচনা সভায় বলেন, 'একুশে বইমেলা কেবল বই বিক্রির সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক মেলা নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতা চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম, মুক্তচিন্তা ও উদার মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে এই বইমেলা চিরকাল আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।'
বইমেলার পরিসমাপ্তিতে লেখক ও প্রকাশকরা এক ঐতিহাসিক বই বিক্রির রেকর্ড উদযাপিত করেছেন। সাহিত্য সমালোচকরা বলেছেন, বইয়ের প্রতি একটি জাতির এই গভীর অনুরাগই প্রমাণ করে যে বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রা কোনো প্রতিকূলতাতেই স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। অমর একুশে বইমেলা বাংলার সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চিরন্তন প্রেরণা জোগাবে।
