বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চাপে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি খাতটির জন্য।
আশুলিয়ায় হা-মীম গ্রুপের কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর শিল্পখাতে গ্যাসের দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ২০২৫ সালে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার এবং সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি না হওয়ায় বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে কারখানাগুলো।
দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি, দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাও সংকটকে আরও গভীর করেছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব মিলিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ায় প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ সরবরাহও পিছিয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রণোদনা দেওয়া, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা আধুনিক করা এবং নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বড় শিল্পকারখানার জন্য সৌরবিদ্যুৎ এককভাবে পর্যাপ্ত নয়, কারণ এসব কারখানায় দিনরাত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে টিকে থাকতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় ও সময় বাড়লে বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশে অর্ডার সরিয়ে নিতে পারেন। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাহিদা বাড়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকার আগামী দিনে সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রসহ নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি নিজস্ব গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ৩০০টি নতুন কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং দেশের বৃহত্তর শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।




