রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিনটি ভুয়া পূজামণ্ডপের নামে সরকারি বরাদ্দের ১ হাজার ৮০০ কেজি চাল উত্তোলনের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার রায়ের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া একটি পূজামণ্ডপের জন্য বরাদ্দ করা ৬০০ কেজি চাল না দিয়ে কমিটিকে মাত্র ১১ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযুক্ত তপন কুমার রায় বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের রংপুর জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এবং গঙ্গাচড়া উপজেলা শাখার আহ্বায়ক।
অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব পূজামণ্ডপের নামে চাল উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়, সেগুলো হলো গঙ্গাচড়ার পুটিমারী পশ্চিমপাড়া দুর্গামন্দির ও পশ্চিম খাপড়িখাল সার্বজনীন দুর্গামন্দির এবং রংপুর সদর উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের দোনদোড়া সার্বজনীন দুর্গামন্দির।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গঙ্গাচড়ায় ৯৮টি স্থানে দুর্গাপূজা আয়োজনের কথা ছিল। প্রতিটি মণ্ডপের জন্য ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। মণ্ডপের সভাপতির পরিচয়পত্র জমা নিয়ে বরাদ্দের ডিওর মাধ্যমে চাল বিতরণের নিয়ম রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তপন কুমার রায় তিনটি মণ্ডপের ভুয়া সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পরিচয় ব্যবহার করে ডিও সংগ্রহ করে মোট ১ হাজার ৮০০ কেজি চাল উত্তোলনের চেষ্টা করেন। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের তৎপরতা শুরু হলে শনিবার দুপুরে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে ডিও তিনটি জমা দেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও পশ্চিম খাপড়িখাল ও দোনদোড়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের নামে সরকারি অনুদানের ১ হাজার কেজি চাল উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
পশ্চিম খাপড়িখাল সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের সভাপতি পরিমল চন্দ্র রায় জানান, অর্থসংকটের কারণে তাঁদের মন্দিরে গত দুই বছর ধরে দুর্গাপূজা হচ্ছে না। তাঁর দাবি, গত বছর ও চলতি বছর উপজেলা পূজা উদ্যাপন কমিটি থেকে তাঁকে ফরম দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর স্বাক্ষর জাল করে চাল উত্তোলনের চেষ্টা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
পুটিমারী পশ্চিমপাড়া দুর্গামন্দিরের সভাপতি স্বাধীন চন্দ্রও জানান, চলতি বছর তাঁদের মন্দিরে পূজার আয়োজন হয়নি। তাঁর অভিযোগ, মন্দির কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই তাঁদের নামে এ ধরনের কার্যক্রম করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে তিনি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি পূজামণ্ডপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, ঠাকুরপাড়া দুর্গামন্দিরের নামে বরাদ্দ নেওয়ার পর মন্দির কর্তৃপক্ষকে মাত্র ১১ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থ তপন কুমার রায় নিয়ে নিয়েছেন বলে তাঁদের দাবি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মন্দির কমিটির সভাপতির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রংপুর সদর উপজেলার খলেয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোত্তালেবুল হক জানান, দোনদোড়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরটি তাঁর ইউনিয়নের বাইরে হলেও তিনি ওই মন্দিরের জন্য সরকারি বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছেন। চলতি বছরও সদর উপজেলা থেকে ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে গঙ্গাচড়া উপজেলা থেকে চাল উত্তোলন করা হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।
বেতগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মারুফ বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম এড়াতে বরাদ্দ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে তপন কুমার রায় বলেন, যা হয়েছে, তা প্রচার না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, আগামীতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেখছেন এবং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার জানান, তিনি বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন। শনিবার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এসে তিনটি ডিও প্রত্যাহার করেছেন। গত বছর ভুয়া পূজামণ্ডপ দেখিয়ে চাল উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূজা শেষ হলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।




