যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনে মূল লড়াই দেশটির দুই কক্ষবিশিষ্ট কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চাইছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশা করছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। এরই মধ্যে আগাম ভোট দিয়েছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ভোটার। নির্বাচনের ফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এবং তাঁর প্রশাসনের নীতির প্রতি ভোটারদের মনোভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত একাধিক জরিপে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রার্থীদের সমর্থনের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে। অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ, ট্রাম্পের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব এবং ডেমোক্র্যাট ভোটারদের বাড়তি অংশগ্রহণের আগ্রহ দলটির পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখছে বলে জরিপগুলোতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটারদের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অভিবাসন। তবে এসব ইস্যুতে দুই দলের সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পিউ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৮৪ শতাংশের কাছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিপাবলিকান সমর্থকদের ৮২ শতাংশ এবং ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৮৮ শতাংশ এ মত দিয়েছেন।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৮৫ শতাংশ। রিপাবলিকানদের মধ্যে এ হার ৬৯ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন ৮২ শতাংশ ডেমোক্র্যাট সমর্থক, বিপরীতে রিপাবলিকানদের মধ্যে এ হার ৫৩ শতাংশ।
অন্যদিকে অভিবাসন নিয়ে রিপাবলিকান সমর্থকদের উদ্বেগ বেশি। তাঁদের ৭২ শতাংশ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ হার ৫৩ শতাংশ। সহিংস অপরাধকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ৬৪ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ হার ৩৭ শতাংশ।
অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষও এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। গত ১ নভেম্বর প্রকাশিত এনবিসি নিউজের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা অসন্তুষ্ট। নিজেদের ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ৫১ শতাংশ।
একই জরিপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামগ্রিক কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্টি জানিয়েছেন ৪০ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার। অসন্তুষ্ট ৬০ শতাংশ। এনবিসির জরিপের ৩০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট উত্তরদাতার হার সন্তুষ্টদের ছাড়িয়ে গেছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ওপর তুলনামূলক বেশি আস্থা রয়েছে ভোটারদের। কাইজার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের এক জরিপে ৪২ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ওপর বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন। রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা জানিয়েছেন ২২ শতাংশ।
জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটদের ওপর বেশি আস্থা রেখেছেন ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতা। রিপাবলিকানদের পক্ষে এ হার ২৫ শতাংশ।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি নিয়েও দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ডেমোক্র্যাট ও দলটির প্রতি ঝোঁক রয়েছে এমন ভোটারদের ৯১ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। বিপরীতে রিপাবলিকান সমর্থকদের ৩৯ শতাংশের মতে, তাঁর নীতি অর্থনীতির উন্নতি করেছে। ৩৫ শতাংশ মনে করেন, এসব নীতি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জরিপগুলোতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে দেখতে চাওয়া ভোটারের সংখ্যাও বেশি দেখা গেছে। ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পরিচালিত এনবিসির জরিপে ৫২ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছেন। রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ চান ৪৫ শতাংশ।
এ ছাড়া ২২ থেকে ২৬ অক্টোবর পরিচালিত রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপে সম্ভাব্য ভোটারদের ৫৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দেবেন বা তাঁদের প্রতি ঝোঁক রয়েছে। রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে এ হার ৪৪ শতাংশ।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পালাবদল হয় না। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে প্রেসিডেন্টের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হচ্ছে। সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ভোট হবে ৩৫টিতে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভা ও স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও ভোট দেবেন মার্কিন নাগরিকেরা। দেশটিতে ভোট দিতে হলে আগে নিবন্ধন করতে হয়। এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ২১ কোটি ৩২ লাখ। তাঁদের মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন।
তথ্যসূত্র
চ্যানেল ২৪, আল জাজিরা, এনবিসি নিউজ, পিউ রিসার্চ সেন্টার, কাইজার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন, রয়টার্স, ইপসোস




