ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে এক বিধবা নারীর কাছ থেকে কৌশলে টিপসই নেওয়ার পর এফিডেভিট ও ভুয়া কাবিননামা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। পরে ওই নারী জানতে পারেন, তাকে আব্দুল কদ্দুছ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী স্থানীয় মসজিদ কমিটির কাছে বিচার দাবি করেছেন।
ভুক্তভোগী মোছাম্মৎ আছিয়া বেগমের বয়স ৪৩ বছর।
তিনি ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় এক যুগ আগে তার স্বামী মারা যান। পাঁচ সন্তানের জননী আছিয়া বেগমের তিন ছেলের বিয়ে হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময় বিয়ের প্রস্তাব এলেও তিনি বিয়ে করেননি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে আছিয়া বেগমের দ্বিতীয় ছেলে আসাদুলের বিয়ের সময় প্রতিবেশী আব্দুল কদ্দুছকে উকিল শ্বশুর করা হয়। সেই সূত্রে কদ্দুছের সঙ্গে তাদের পারিবারিক যোগাযোগ ছিল। তিনি বিভিন্ন সময় স্থানীয় আব্দুছ ছাত্তারের মাধ্যমে আছিয়া বেগমকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও তিনি প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় দেড় মাস আগে আব্দুছ ছাত্তার ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে আছিয়া বেগমকে তার দোকানে নিয়ে যান। সেখানে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি নেওয়া হয়। কয়েক দিন পর আবার তাকে ডেকে একটি খাতায় দুটি টিপসই নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে আছিয়া বেগম জানতে পারেন, আব্দুল কদ্দুছের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে—এমন দাবি করে একটি এফিডেভিট ও কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর তিনি স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও সভাপতির কাছে বিচার দাবি করেন।
এ ঘটনায় গত সোমবার সন্ধ্যায় পাটুলী গ্রামের আছিয়া বেগমের বাড়িতে স্থানীয়ভাবে সালিশ বসে। সেখানে উপস্থিত লোকজনের সামনে ভুক্তভোগী নারী ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তবে অভিযুক্ত আব্দুছ ছাত্তার সালিশে উপস্থিত না থাকায় পরবর্তীতে বুধবার আবার সালিশের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের অভিযোগ, আছিয়া বেগমকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর আব্দুল কদ্দুছের পক্ষ থেকে ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে তার টিপসই নেওয়া হয়। পরে সেই টিপসই ব্যবহার করে এফিডেভিট ও কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাজী অফিসের সিলযুক্ত একটি কাবিননামায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেনমোহর এবং নগদ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে আব্দুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামকে সাক্ষী করা হলেও তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন। এ ঘটনায় আব্দুছ ছাত্তার ও আব্দুল হেকিম মাস্টারের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
সাংবাদিক পরিচয়ে মোবাইল ফোনে আব্দুছ ছাত্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আব্দুল কদ্দুছের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ভুক্তভোগী আছিয়া বেগম বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলে একদিন আমার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেওয়া হয়। পরে আরেক দিন ফোন করে ছাত্তারের দোকানে নিয়ে কাগজে টিপসই নেওয়া হয়। এখন গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে যে কদ্দুছ আমাকে বিয়ে করেছে। আমার পাঁচ সন্তান ও নাতনী রয়েছে। এ ঘটনায় আমি মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারছি না। আমি সমাজ ও মসজিদ কমিটির কাছে বিচার দিয়েছি। যারা এ কাজ করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, তার নম্বর, সিল ও স্বাক্ষর জাল করে কেউ এ ধরনের কাগজ তৈরি করে থাকতে পারে। এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রাশেদুল হাসান বলেন, এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শহীদুল ইসলাম সোহাগ ভুক্তভোগী নারীকে সম্মানহানির বিষয়ে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রতারণার নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।




