মেঘনা ও বুড়িগঙ্গায় শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা: হাজারো বৈঠার ছন্দে মাতল লাখো দর্শক
বাংলার আবহমান লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রাণভোমরা ঐতিহ্যবাহী 'নৌকা বাইচ' প্রতিযোগিতা বর্ণাঢ্য আয়োজনে মেঘনা ও বুড়িগঙ্গার বুকে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং বাংলাদেশ রোয়িং ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মহোৎসবে দেশের বিভিন্ন নদী অববাহিকার প্রায় অর্ধশতাধিক সুসজ্জিত বাহারি নৌকা অংশগ্রহণ করে। সারেঙ্গদের মুখে জারি-সারি গান, খোল-করতালের সুর এবং হাজারো মাঝিমাল্লার এক ছন্দে বৈঠা চালানোর অভূতপূর্ব দৃশ্যে নদীর দুই তীরে সমবেত লাখো মানুষ বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠেন।
প্রতিযোগিতায় ময়ূরপঙ্খী, ঘাসি, গোয়েন্দা ও ছিপ জাতীয় বিশালাকার নৌকাগুলোর দ্রুতগতির গতিময় লড়াই দর্শকদের চোখ জুড়িয়ে দেয়। প্রতিটি নৌকায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন দক্ষ মল্ল ও মাঝিমাল্লা দলগত শক্তিতে তীব্র স্রোতের প্রতিকূলে বৈঠা চালিয়ে নিজেদের সেরা গতি তুলে ধরেন। ঢাকঢোলের তালে তালে সারেঙ্গদের উৎসাহমূলক উদ্দীপক গানের তালে তালে বৈঠার ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে নদীর জলরাশি।
চূড়ান্ত ফাইনালে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার 'সোনার তরী' নৌকাটি মুন্সীগঞ্জের 'বাংলার বীর' নৌকাকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি এবং ৫ লাখ টাকার আর্থিক পুরস্কার অর্জন করে। বিজয়ী দলের অধিনায়ক ট্রফি হাতে তুলে নেওয়ার পর বলেন, 'এই বাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তের টান ও নদীমাতৃক বাংলার অহংকার। নতুন প্রজন্মকে এই খেলাধুলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পেরে আমরা গর্বিত।'
সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। উপদেষ্টা ঘোষণা করেন, বাংলার এই অমূল্য গ্রামীণ ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে নৌকা বাইচকে ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ বা অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি বছর জাতীয় পর্যায়ে এই উৎসব উদযাপনে স্থায়ী ক্যালেন্ডার অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইট-পাথরের নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা এবং স্মার্টফোনের যুগে এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী লোকক্রীড়া সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মিলনের অনন্য মেলবন্ধন সৃষ্টি করে। নদীর সাথে মানুষের চিরকালীন সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে এবং তরুণদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ধরে রাখতে গ্রামীণ ক্রীড়া উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম।
