সাফ নারী ফুটবলে টানা দ্বিতীয়বার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ: কাঠমান্ডুর ফাইনালে বাঘিনীদের বীরত্বগাথা
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল মঞ্চে নিজেদের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে তাদেরই ঘরের মাঠে ৩-১ গোলে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে প্রায় পনেরো হাজার উন্মত্ত স্বাগতিক দর্শকের উপস্থিতিতে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ও আধুনিক পাসিং ফুটবলের মাধ্যমে মাঠ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন বাংলার লড়াকু ফুটবল কন্যারা।
ম্যাচের প্রথমার্ধেই দারুণ দলগত বোঝাপড়া এবং উইং দিয়ে নিখুঁত বল ডেলিভারির মাধ্যমে প্রথম গোলটি করেন দলের তারকা ফরোয়ার্ড। বল পেয়ে নেপালের রক্ষণভাগের তিন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে দূরপাল্লার চোখ ধাঁধানো শটে বল জালে জড়াতেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো স্টেডিয়াম। দ্বিতীয়ার্ধে স্বাগতিক নেপাল এক গোল শোধ করে ম্যাচে ফেরার জোর চেষ্টা চালালেও বাংলার গোলরক্ষকের দুর্দান্ত কিছু সেভ এবং সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ নেপালের সমতায় ফেরার স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেয়।
ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে মিডফিল্ড থেকে বাড়ানো দারুণ থ্রু পাস ধরে অসাধারণ গতিতে বক্সে ঢুকে প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে পরপর দুটি গোল করে দলের অবিস্মরণীয় জয় নিশ্চিত করেন দলের অধিনায়ক ও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। বাঁশি বাজার সাথে সাথে পুরো দল লাল-সবুজ পতাকা মাথায় বেঁধে মাঠজুড়ে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে। টুর্নামেন্টে পুরো আসরে একটি ম্যাচেও না হেরে এবং সর্বোচ্চ গোল দিয়ে ফেয়ার প্লে ট্রফিসহ প্রতিটি ব্যক্তিগত পুরস্কার নিজেদের ঝুলিতে পুরে নেয় বাংলাদেশ।
হিমালয় জয়ের এই ঐতিহাসিক বীরত্বগাথায় পুরো বাংলাদেশ আনন্দে ভাসছে। বিমানবন্দর থেকে চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য তৈরি করা হয়েছে সুসজ্জিত ছাদখোলা বাস, যার মাধ্যমে তাদের বিমানবন্দর থেকে মতিঝিল বাফুফে ভবন পর্যন্ত বর্ণাঢ্য গণসংবর্ধনা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে লাখো মানুষ ফুল ছিটিয়ে ও হাত নেড়ে এই বীর কন্যাদের অভিবাদন জানান। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) দলের প্রতিটি সদস্যের জন্য স্থায়ী বেতন বৃদ্ধি, বিশেষ আর্থিক অনুদান এবং আন্তর্জাতিক মানের দীর্ঘমেয়াদী আবাসিক প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে।
ফুটবল গবেষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল, চা বাগান ও গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে সমাজের নানা কুসংস্কার ও বাধা-বিপত্তি জয় করে এই মেয়েরা যে ইতিহাস গড়েছেন, তা সমগ্র জাতির জন্য অসীম গর্বের ও আত্মবিশ্বাসের উৎস। এই সাফল্য দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারী জাগরণের এক অপ্রতিরোধ্য অনুপ্রেরণা হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক এশিয়ান কাপ ও বিশ্বকাপ মঞ্চেও বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা আরও উঁচুতে ওড়ানোর আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
