ডেঙ্গু-হামের চাপে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম, পেশায় গাড়িচালক। ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য গত ১২ সেপ্টেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান তিনি। ৫৫ বছর বয়সী শহীদুল সেখানে গিয়ে দেখেন, হাসপাতালে রোগীর প্রচণ্ড ভিড় এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি।
শহিদুল ইসলামের চাচাতো ভাই শামসুল হক শাহজাহান জানান, হাসপাতালে সিট বা শয্যা না পাওয়ায় প্রথম রাত তাকে মেঝেতেই কাটাতে হয়েছে। পরের দিন তিনি ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডে একটি সিট পান। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা এই ওয়ার্ডের ৫০টি সিটই রোগীতে পূর্ণ। নার্সরা জানান, রোগী বাড়ায় এখন অনেককে সাধারণ মেডিসিন ওয়ার্ডেও পাঠানো হচ্ছে।
পাবনার সাঁথিয়া থেকে দুই সপ্তাহ আগে একটি অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে আসেন ৭৫ বছর বয়সী রোকেয়া বেগম। কিন্তু অস্ত্রোপচারের আগেই ডেঙ্গু ধরা পড়লে তাকে ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়, যেটি মূলত গাইনি ওয়ার্ড। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সেই ওয়ার্ডের ৪১টি সিট রোগীতে পূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডটি আগে পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ড ছিল। বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রভাবে এটিসহ অন্যান্য ওয়ার্ড যেভাবে নতুন করে সাজানো হয়েছে, তা থেকেই স্পষ্ট যে ডেঙ্গুর কারণে সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা চাপের মুখে পড়েছে।
এমন অবস্থা কেবল এই হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাবে সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো বেশ চাপের মুখে পড়েছে।
সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা যেমন দ্রুত বেড়েছে, তেমনি আগস্ট মাস থেকে নতুন করে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এই মাসের শেষ সপ্তাহে অথবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট হাসপাতালের সিট বা শয্যা সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৩টি। এর মধ্যে প্রাথমিক থেকে উন্নত পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে অনুমোদিত শয্যা রয়েছে ৭১ হাজার ৯৬২টি এবং নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৯২ হাজার ৬০১টি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর এক দিনেই হাম ও ডেঙ্গু মিলিয়ে মোট ১০ হাজার ১২১ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর মধ্যে হাম বা এর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৫ হাজার ৯৫৯ জন। আর ডেঙ্গু নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৪ হাজার ১৬৬ জন। অর্থাৎ দেশের মোট শয্যার প্রায় ১৬ ভাগের এক ভাগই ওইদিন এই দুই রোগে আক্রান্ত রোগীদের দখলে ছিল।
এই দুই রোগে ১৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে মোট ভর্তি ছিল ৯ হাজার ৭৫৫ জন, যা পরের দিনই বেড়ে ৯ হাজার ৯৫১ জনে দাঁড়ায়।
সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনে হাসপাতালগুলোতে ১৫ হাজার ৯৭৫ জন হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ২১ হাজার ৭০ জন ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি ছিলেন। এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৬৫ জন হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ১ হাজার ৪০৪ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত রোগীর সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি। কারণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই তথ্যে সরকারি হাসপাতাল ছাড়া মাত্র ৫৯টি বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র উঠে এসেছে। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি খাতে সম্প্রতি যে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, তা হয়তো ২০২৪ সালের এই পরিসংখ্যানে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।
এদিকে, ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কৌশলে পরিবর্তন আসায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মতো হাসপাতালগুলোতে ওপর রোগীর চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
গত বছর রাজধানীর ডেঙ্গু চিকিৎসায় ৬০০ শয্যার ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সে সময় হাসপাতালটি ৫৪টি আইসিইউ শয্যাসহ ৭ হাজার ২০০ জনেরও বেশি রোগীকে সেবা দিয়েছিল।
কিন্তু চলতি বছরের মাঝামাঝি মার্চে হাসপাতালটিকে শুধুমাত্র হামের চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে কর্তৃপক্ষ সেখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বন্ধ করে দেয়। এই পরিবর্তনের আগে হাসপাতালটিতে মাত্র ৮১ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নেন।
হাসপাতালটির এই পরিবর্তনের ফলে ডেঙ্গু রোগীদের এখন অন্যান্য বড় সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। এতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো হাসপাতালে রোগীর চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ২ হাজার ৬৫৬ জন ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে, যা যেকোনো হাসপাতালের মধ্যে সর্বোচ্চ।
হাসপাতালের পরিচালক নন্দ দুলাল সাহা জানান, ১ হাজার ৩৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ১৯১টি শয্যা নির্ধারিত থাকলেও বুধবার দিন সেখানে ২৪৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তিনি জানান, রোগীর এই বাড়তি চাপ সামলাতে হাসপাতালটিতে এখনও বাড়তি কোনো জনবল দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের সাধারণ মেডিসিন ওয়ার্ডে অথবা মেঝেতে জায়গা করে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।’
অন্যান্য রোগের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে কি না—সে বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও তিনি চাপের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দিতে পারি না। এটি আমাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।’
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থাও অনেকটা একই রকমের। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে চলতি বছরের শুরুর দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও ৫০০ শয্যা বাড়ানোর অনুমোদন দিলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল এখনও সেখানে পৌঁছায়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অতিরিক্ত তিনটি ফ্লোর বরাদ্দ করেছে, যেখানে প্রায় ২০০ প্রাপ্তবয়স্ক ও ১০০ শিশু রোগীর জায়গা হয়। গতকালের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, হাসপাতালটিতে মোট ১ হাজার ৩১৪ জন রোগী ভর্তি ছিলেন—যা এর মূল ধারণক্ষমতার আড়াই গুণেরও বেশি। এর মধ্যে ২১৮ জন ডেঙ্গু ও ৫৩ জন হামে আক্রান্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক গতকাল বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা তিনটি ফ্লোরে হাতে অল্প কিছু সিটের ব্যবস্থা করা গেছে, কিন্তু বেশির ভাগ রোগীকেই মেঝেতে তোষক বিছিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
রোগীর এই চাপ শুধু রাজধানী ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়।
ঝালকাঠিতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬৯ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। সেখানে ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালটিতে বর্তমানে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি রয়েছে।
হাসপাতালটির ১৫০ শয্যার একটি সম্প্রসারিত ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে কর্তৃপক্ষ পার্শ্ববর্তী একটি ভবনে ২৮টি অস্থায়ী শয্যা এবং মূল হাসপাতালের ভেতরে ১২টি ডেডিকেটেড ডেঙ্গু শয্যা প্রস্তুত করেছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মাসুম ইফতেখার জানান, গত কয়েক দিনে চাপ কিছুটা কমেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন রোগী ভর্তি হতো, মঙ্গলবার তা কমে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একসঙ্গে দুই রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তারা স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরে সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি ১০০টিরও বেশি শয্যা যুক্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও শয্যা বাড়ানো হবে।’
জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গত দুই-তিন দিনে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩ জন অতিরিক্ত চিকিৎসক দিয়েছি। এ ছাড়া আরও নার্স ও কর্মী দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’
ডা. বিশ্বাস আরও বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি তাদের আগেই জানা ছিল এবং হাসপাতালগুলোকে বাড়তি জায়গা প্রস্তুত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এই সময়ে ডেঙ্গু রোগীর এমন তীব্র বৃদ্ধি অনুমিত ছিল। তাই আমরা আগে থেকেই হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলাম, তারাও সে অনুযায়ী কাজ করছে। এখন পরিস্থিতি কেমন হয়, তার ওপর বাকিটা নির্ভর করছে।’
তিনি জানান, রোগীর সংখ্যা যদি আরও বাড়ে, সেক্ষেত্রে সরকার ফিল্ড হাসপাতাল বা অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরির কথাও ভাবছে।
ডা. বিশ্বাস বলেন, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের সেবার ধরনে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এটাই এখনকার বাস্তব চিত্র। তবে আমরা অবশ্যই রোগীদের, বিশেষ করে যাদের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’
