যানজট ও দূষণমুক্ত শহরের স্বপ্ন: দুই চাকায় স্বাস্থ্যকর জীবন ও নগরীতে সাইক্লিং সংস্কৃতির নবজাগরণ
অসহনীয় ট্রাফিক জ্যাম, হর্নের তীব্র শব্দ এবং বিষাক্ত কালো ধোঁয়ার নগরজীবনকে পেছনে ফেলে এক নতুন ও সুস্থ বিপ্লবের সূচনা করেছেন বাংলাদেশের তরুণ ও সচেতন নাগরিকরা। প্রতিদিনের অফিস যাতায়াত, বিশ্ববিদ্যালয় গমন কিংবা সান্ধ্যকালীন শরীরচর্চায় পরিবেশবান্ধব সাইকেল আজ হয়ে উঠেছে গতি ও স্বাধীনতার প্রতীক। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর রাজপথে প্রতিদিন ভোরে ও বিকেলে সুশৃঙ্খল হেলমেট ও সেফটি গিয়ার পরিহিত হাজার হাজার নারী-পুরুষ সাইক্লিস্টের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, দুই চাকার এই বাহনটি কেবল একটি শখ নয়, বরং এটি নগর রূপান্তরের এক শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সাইকেল চালানো হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে, শরীরের অতিরিক্ত ক্যালরি পুড়িয়ে মেদ কমায় এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেয়। জিমে গিয়ে দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করেই প্রতিদিনের যাতায়াতের মাধ্যমেই শরীরের প্রয়োজনীয় কার্ডিওভাসকুলার এক্সারসাইজ সম্পন্ন হয়ে যায়। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময় সাইক্লিং মানুষের মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন নামক আনন্দদায়ী হরমোন নিঃসরণ ঘটায়, যা কাজের উদ্দীপনা ও মানসিক প্রশান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পরিবেশের দিক থেকেও সাইক্লিংয়ের প্রভাব অপরিসীম। একটি সাধারণ মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কার প্রতিদিন যে পরিমাণ বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা বাতাসে ছড়ায়, সাইকেল সম্পূর্ণভাবে সেই দূষণমুক্ত। শত শত নাগরিক যখন ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি বাদ দিয়ে সাইকেলে চলাচল শুরু করেন, তখন শহরের ট্রাফিক জ্যাম নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায় এবং মূল্যবান জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়।
সাইক্লিস্টদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে নগর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও সাইক্লিং কমিউনিটির দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা ও রাজশাহীর প্রধান সড়কগুলোতে পৃথক ও সুরক্ষিত 'ডেডিকেটেড সাইকেল লেন' নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে নিরাপদ সাইকেল পার্কিং স্ট্যান্ড ও লকার স্থাপন করা হচ্ছে, যাতে সাইকেল নিয়ে নাগরিকরা স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারেন।
জীবনযাপন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শহরের আধুনিকতার আসল মাপকাঠি কতগুলো ফ্লাইওভার বা দামি গাড়ি আছে তা নয়; বরং তার নাগরিকরা কত নিরাপদে হাঁটতে ও সাইকেল চালাতে পারছেন সেটাই তার আসল পরিচয়। সাইক্লিং সংস্কৃতি কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যই ভালো রাখে না, এটি একটি সমতাভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক নগরী গড়ে তুলতে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
